বাংলাদেশি এনআইডি বানালেন ভারতীয় নাগরিক

ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার বনতাই ডাঙ্গাপাড়া সানি মন্দির এলাকার বাসিন্দা সাহের আলী সরদার। বাংলাদেশের রাজশাহীর পুঠিয়া এসে নাম ধারণ করেছেন আকাশ প্রামাণিক। এখানে তিনি বানিয়েছেন জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি কার্ডও। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও পরিচয়ের সূত্র ধরে পুঠিয়ার আসমা বেগমকে মা এবং আব্দুল আজিজকে বাবা হিসেবে এনআইডিতে যুক্ত করেছেন। ঘটনাটি জানাজানির পর জেলা প্রশাসন এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আইডি কার্ড অনুযায়ী সাহের আলীর বাবার নাম সোহরাব সরদার। ওই কার্ড নম্বর ৩৩৯৯৯১৬৬৩৯১৫ জন্ম তারিখ ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি। কিন্তু সাহের আলী সরদার গোপনে নাম ও ঠিকানা পাল্টে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার নাম মো. আকাশ প্রামাণিক। এ দেশে তার জন্মনিবন্ধন সনদ নম্বর ১৯৯৮৮১১৮২৫৪১০৫৭৮৯, যেখানে জন্ম তারিখ উল্লেখ আছে ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৮। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া গ্রাম। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও বাবার নাম লিখেছেন মো. আজিত আলী মায়ের নামের স্থলে লিখিয়েছেন মোছা. আসমা বেগমের নাম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ভারতীয় নাগরিক কয়েক বছর আগে আত্মীয়ের বাড়ি এসে আর ফিরে যাননি। পরে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশি নাগরিক সেজেছেন। বিয়েও করেছে ধোপাপাড়ায়। বর্তমানে আকাশ প্রামাণিক হিসেবে তিনি কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করছেন। সম্প্রতি ঘটনাটি জানাজানি হয়। তার নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন ওই ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে মা হিসেবে দেখানো আসমা বেগম। ভারতীয় নাগরিক কীভাবে বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন এবং এনআইডি করেছেন তা তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

জানা গেছে, সাহের আলী নাম পাল্টে আকাশ প্রামাণিক সেজে বাংলাদেশের জন্মনিবন্ধন পেয়েছেন ২০২০ সালের ২৩ মার্চ। আর তিনি এনআইডি পান ২০২২ সালের ২৮ জুলাই। ভারতীয় নাগরিক সাহের আলী ২০২৪ সালের ১২ জুলাই পুঠিয়ার ধোপাপাড়া গ্রামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। সাহের আলী বর্তমানে আকাশ প্রামাণিক সেজে কক্সবাজারের রয়েল সি বিচ নামে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করছেন।

অভিযোগকারী আসমা বেগম বলেন, ‘প্রায় সাত বছর আগে মানবিক কারণে আশ্রয়হীন ছেলে হিসেবে সাহের আলী সরদারকে আমি নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিই। ওই সময় সে নিজেকে অসহায় বলে পরিচয় দেয়। আমি মায়া করে থাকতে দিয়ে ছিলাম। সে আমার বাড়িতেই থাকত। পরে জানতে পারি, সে গোপনে আমার ও আমার স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘মো. আকাশ প্রামাণিক’ নামে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরি করেছে। সে পরে আমাদের ছেলে হিসেবে দাবি করে জমির ভাগও দাবি করে। সে আমাদের এনআইডি ব্যবহার করে আমাদের নাম ব্যবহার করে জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি কার্ড বানিয়েছে এটি জানতে পারার পর আমরা আসল তথ্য জানার চেষ্টা করি। সে যে ভারতের নাগরিক এটা জানতে পারার পর আমরা নিশ্চিত হওয়ার পরই বিষয়টা ইউএনওকে জানিয়েছি, সে যে দেশের নাগরিক, তাকে সে দেশে ফিরে যেতে হবে।

আসমা বেগম জানান, সে কাজ করে কিছু টাকা জমায় এবং পরে আলাদাভাবে বসবাস শুরু করে। সে নাটোরে গিয়ে নিজেকে আমার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র করেছে। তার ব্যবহৃত সিমও আমার নামে তোলা ছিল। সে এ দেশেই বিয়েও করেছে। এখন আমি চাই প্রশাসন যেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

তবে, অভিযুক্ত সাহের আলী সরদার ওরফে আকাশ প্রামাণিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাকে ভারত থেকে তার (আসমা দম্পতি) বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং তারাই এসব কাগজপত্র তৈরি করে দেয়। আমি কোনো প্রতারণা করিনি। আমি এতিম ছিলাম। পরে তারা আমাকে মৌখিকভাবে দত্তক নেয়। তাদেরই উদ্যোগে আমার জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র করা হয়। আমি জানতাম না এতে কোনো সমস্যা হবে। তবে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হয়তো ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই তারা এমন অভিযোগ করছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিয়াকত সালমান বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে তদন্তের নির্দেশনা এসেছে। উপজেলা কৃষি অফিসারকে তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, তদন্ত কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিসার স্মৃতি রানী সরকার বলেন, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ভারতের নাগরিক। তিনি স্থানীয়দের পরিচয় ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি সংগ্রহ করেছেন। তদন্ত শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে।

এদিকে, এত পরীক্ষা নিরীক্ষার পর যেখানে এনআইডি কার্ড হয় সেখানে এত সহজে কীভাবে ভারতীয় নাগরিক এনআইডি কার্ড করেছে, জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেটও করেছেন এটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীরাও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কি না সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।