আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, যানবাহন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, পর্যবেক্ষক আগমন, বাজেট ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা সহায়তাসহ নির্বাচন-সম্পর্কিত নানা বিষয়ে সমন্বয় করতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে সরকারের ৩১টি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে ইসির সমন্বয় ও প্রস্তুতিমূলক বৈঠক শেষে সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এসব তথ্য জানান।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় চার নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন,শিক্ষা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
ইসি সচিব জানান, কমিশন ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরে এনেছে। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ভোটকেন্দ্র এবং সেখানে যাওয়ার রাস্তা মেরামত ও সংস্কারের অনুরোধ জানিয়েছি।
ফেব্রুয়ারি মাসে আবহাওয়া অনুকূল থাকলেও আগে থেকেই এসব কেন্দ্রের প্রবেশগম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগে-ভাগে প্রস্তুত করে রাখেন।
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রসঙ্গে আখতার আহমেদ বলেন, ‘ইসি প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল তৈরি করছে, যেখানে সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক এবং সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও থাকবেন। মূলত প্রিসাইডিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার এই তিনটি পদ প্রত্যেকটি কেন্দ্রের জন্য লাগবে। আপনারা জানেন, ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা গতকাল আমরা জানিয়েছি ৪২,০০০ প্লাস। সেই অনুযায়ী আনুপাতিকভাবে কর্মকর্তাও লাগবে।’
দুর্গম এলাকায় নির্বাচনের পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের হেলিকপ্টার সার্ভিস ব্যবহার করা হবে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘সেটি বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী বা অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া যাবে। কিন্তু হেলিপ্যাড যেখানে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করবে সেই প্যাডটা তৈরি করা, সমতল করা এবং চিহ্নিত করার দায়িত্ব উপজেলা লেভেল পর্যন্ত এবং দুর্গম এলাকাগুলোর জন্য নির্ধারিত থাকবে। আমরা অনুরোধ করেছি যেন স্থানীয় প্রশাসন এটা সম্পন্ন করে।’
নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, জনসচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করবে জানিয়ে সচিব আরও বলেন, ‘নির্বাচনে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার তারা আমাদের সহায়তা করবে। এ ছাড়া আমরা সংসদ টেলিভিশনের এয়ারটাইম ব্যবহার করার বিষয়ে আলোচনা করছি, যাতে প্রচার-প্রচারণা চালানো যায়। বিটিভি নিউজেও ফ্ল্যাশ নিউজের মাধ্যমে আমাদের কার্যক্রম প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঋণখেলাপি-সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চার-পাঁচ দিন সময় পেলে তারা সঠিকভাবে তথ্য দিতে পারবেন। তাই তাদের জন্য সামান্য স্পেস রাখা উচিত। ইসি তাদের সময় দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জানায়।
বাজেটে ব্যয় প্রসঙ্গে আখতার আহমেদ বলেন, প্রচার-প্রচারণার সঙ্গে বাজেট জড়িত। সবাইকে বলা হয়েছে, বাজেটের ব্যাপারে সাশ্রয়ী হতে হবে। প্রয়োজনীয় খরচ হবে, তবে অপ্রয়োজনীয় খরচ যেন না হয়। এ ছাড়া যানবাহন, পেট্রোলরিকুইজিশন করার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে যতটুকু প্রয়োজন, শুধু ততটুকুই করা হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর যানবাহন ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, শৃঙ্খলা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ব্যাপারে জনপ্রশাসন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব সবাই একমত। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই যেন তারা পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করতে পারেন, যাতে আচরণবিধি বাস্তবায়নে সমস্যা না হয়। প্রয়োজনীয়সংখ্যক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আইন মন্ত্রণালয় থেকে কমিশনের অনুরোধ অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি যেন নির্বাচনের সঙ্গে না মিলে যায়, সেদিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে, সাধারণত এ সময় এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষা থাকে না। রমজানও থাকবে না। তাই পাবলিক পরীক্ষার সঙ্গে যেন কোনো সংঘর্ষ না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হবে।
সচিব জানান, ভোটের দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিদ্যুৎ সচিবকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোট গণনা অনেক সময় রাত পর্যন্ত চলে যায়। তাই বিদ্যুৎ বিঘœ যাতে না হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি ক্লাস্টার এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন করতে বলা হয়েছে, যাতে জরুরি কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
ইসি সচিব বলেন, এবার পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থায় প্রবাসী, সরকারি চাকরিজীবী ও নির্বাচনী কার্যক্রমে জড়িত কর্মকর্তারা ভোট দিতে পারবেন। ১৬ নভেম্বর অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অপব্যবহার রোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপপ্রচার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চলবে। এনটিএমসি থেকে ব্যবহৃত একটি অ্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার উপযোগিতা নিশ্চিত হলে ব্যবহার করা হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়মিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছে।
বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি হবে। জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তা করবে। তফসিল ঘোষণার পর প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
দল নিবন্ধন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ শেষে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ার সরকার তা পর্যালোচনা করছেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ফাইনালাইজ হবে বলে আশা করছি। প্রয়োজনে সপ্তাহান্তেও আমরা কাজ করব।’