বাংলাদেশের ৫৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে মাত্র সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বিদ্যমান। এগুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া গণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ চালু আছে। এর মধ্যে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি হওয়ার পরেও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং শাকসু নির্বাচন নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের দিক থেকে দ্বিতীয় প্রাচীন ছাত্র সংসদ হয়েও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচনের কোনো ঘোষণা বা রোডম্যাপ এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রশাসন বারবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ বাকসু থেকে উঠে আসা একাধিক ছাত্রনেতা পরবর্তী সময়ে দেশের এমপি, মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারণী জায়গায় অবদান রেখেছেন। তাই তো ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিপরীতে ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। যদিও তাদের এসব দাবি পূরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি গত ১৪ মাসে।
আজ থেকে দীর্ঘ ২৭ বছর আগে সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে বাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে বাকসুর জন্য বরাদ্দকৃত ১৬টি কক্ষ হয়ে পড়ে নির্জীব, নিষ্প্রাণ। সেই কক্ষগুলো এখন ব্যবহার হচ্ছে অন্য কাজে। টিএসসিতে অবস্থিত বাকসু ভবনের সামনের গাছে আড়াল হয়েছে নামফলকও।
অথচ ২৭ বছর স্থবির থাকার পরও প্রতি বছরই সব শিক্ষার্থীকে কাছ থেকে ছাত্র সংসদের নামে ফি নেওয়া হচ্ছে। বাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি-দাওয়া সঠিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। বাকসুকে কেন্দ্র করে যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা নানা দিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সময়ের সঙ্গে উপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম, আবাসন সংকট, উন্নত ডাইনিং সুবিধা, ছাত্র উপবৃত্তির হার বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ন্যায্য অধিকার আদায় থেকে বঞ্চিত। তাই তো অনেক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করেই বলেন, ‘ডাকসু হচ্ছে, রাকসু হচ্ছে, জাকসুও হচ্ছে, বাকসু কি দোষ করল? বাকসু কী হবে না? এই বিশ্ববিদ্যালয় কি তবে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যাচ্ছে!’
একটি কার্যকর ছাত্রসংসদ থাকলে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্ব সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতো। বাকসু নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ বিকাশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরির মানোন্নয়নসহ নানা বিষয়ে ছাত্রসমাজের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিফলিত হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটি নির্বাচিত ছাত্রসংসদ থাকলে র্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে। বিশ্বাস করি, বাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার ধারা সুসংহত করবে এবং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরি।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একসময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, ‘দেশের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হলেই, বাকসু নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’
কিন্তু এর বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাকসুর সেই আশার আলো আজ নিভে গেছে। কেননা বর্তমান প্রশাসন জানিয়েছে, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে বাকসু নির্বাচন হবে না।’ এভাবেই শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আক্ষেপ আর অপেক্ষা দুটোই দীর্ঘ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ছাত্র সংসদ’ই শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন। তাই প্রশাসনের প্রতি আহ্বান বাকৃবিতে বাকসু নির্বাচন অবিলম্বে আয়োজন করা হোক। বর্তমান প্রশাসনের টালবাহানা ও অদক্ষ পরিচালনা শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে কবে নাগাদ দেখা যাবে বাকসুর নবজাগরণ?
যেমন এই অন্ধকার রাতের মতো গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে বাকসু ভবনের নামফলক, তেমনি কি আড়ালেই থেকে যাবে বাকসুর ভবিষ্যৎ? নিভৃত অন্ধকারেই কি হারিয়ে যাবে বাকৃবির ছাত্র সংসদ নির্বাচন?
লেখক : শিক্ষার্থী, হর্টিকালচার বিভাগ (স্নাতকোত্তর), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ