গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় নিস্তব্ধ ‘দুধের গ্রাম’

কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ছিলোনিয়া গ্রাম এক সময় পরিচিত ছিল ‘দুধের গ্রাম’ নামে। সকাল বেলায় উঠলেই ঘরে ঘরে শোনা যেত গরুর হাম্বা হাম্বা ডাক, আর চিরিৎ চিরিৎ শব্দে বালতিতে পড়ত সাদা দুধের ধারা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত দুধের মিষ্টি ঘ্রাণ। যেন পুরো গ্রামটাই এক বিশাল দুগ্ধখামার। কিন্তু সেই সোনালি সকাল এখন স্মৃতিমাত্র। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি আর দুধের দাম না বাড়ায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে ২০০ খামার। সেখানে খালি পড়ে আছে গরুর ঘর, ফাঁকা বালতি, শুকনো খাদ্যপাত্র। যে গ্রামে এক সময় সকাল মানেই দুধের উৎসব ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা।

ছিলোনিয়াসহ পাশের গজারিয়া, হাপানিয়া, উৎসবপদুয়া, মাতাইনকোট, দোসারি চৌ, জামমুড়া, শাসনমুড়া, আটিটি, বাটোরা মোট ১২টি গ্রামে আগে দুধ সংগ্রহ আর বিক্রির এক বিশেষ আমেজ ছিল। এখন সেই চিত্র উল্টো।

শুধু ছিলোনিয়া গ্রামেই গত ৬ বছরে আড়াইশ খামারের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ২০০টি। কোথাও খামারের খালি পাত্রে এখন রাখা হয় মাছ ধরার ছাই বা পুরনো সাইকেলের টায়ার। তবে ছিলোনিয়া গ্রামের খামারি নাইমুল ইসলাম এখনো হাল ছাড়েননি। তার খামারে আছে ১৮টি গাভী। বললেন, ‘দুধের দাম কমে গেছে, কিন্তু খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া। আয় কমে গেছে অর্ধেক। সরকার যদি খাদ্যে ভর্তুকি দেয়, তাহলেই আমরা টিকতে পারব।’

লোকসানের ভেতর বেঁচে থাকা খামারি জয়নাল আবেদীন ২০০৮ সালে তিনটি গাভী দিয়ে শুরু করেছিলেন। এক সময় তার ছিল ২৩টি গরু, এখন আছে মাত্র ১৩টি। এক কেজি গো-খাদ্যের দাম ৫৫ টাকা, আর এক কেজি দুধ বিক্রি হয় ৪০ টাকায়। আগে শ্রমিকের মজুরি ছিল ৩০০ টাকা, এখন ৭০০ টাকা। আয় তিন হাজার, খরচ পাঁচ হাজার এই খরচে খামার টিকবে কীভাবে প্রশ্ন জয়নাল আবেদীনের।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চার হাজার ৫৮২টি দুগ্ধখামার রয়েছে। তার মধ্যে ২০২৩ সালে ২৮ হাজার টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪ সালে ২৯ হাজার ৪৪০ টন দুধ উৎপাদন হয়। ২০২৫ সালে এসে এর লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়েছে ৫৩ হাজার টন। তবে বাস্তবে তা উল্টো। ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কতটি দুগ্ধখামার বন্ধ হয়েছে তার সঠিক কোনো তথ্য নেই জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সামছুল আলমের কাছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সামছুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দানাদার খাদ্যের দাম বহুলাংশে বেড়ে গেছে। অথচ খামারিরা দুধের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তারা কোনো ভর্তুকিও পান না। আমরা তাদের ঘাস জাতীয় খাদ্যের দিকে নজর দিতে বলেছি। খাদ্যে ভর্তুকি ও খামারের বিদ্যুৎ বিল কৃষির আওতায় আনার বিষয়েও উদ্যোগ চলছে।’