বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী নেতারা। যে কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আসছেন না, এমনকি নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও দেখাচ্ছেন না। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ স্থবিরই থাকবে।
গতকাল সোমবার গুলশানের এক হোটেলে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আয়োজিত ‘বিজনেস ক্লাইমেট : রিফর্মস, অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ সত্ত্বেও নির্বাচিত ও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার না আসা পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থায় থাকবেন। পত্রিকাটির সম্পাদক শামসুল হক জাহিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘যে দেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগুন নেভাতে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই, নীতি ধারাবাহিকতা নেই, জ্বালানি নিরাপত্তা নেই, সেখানে কে বিনিয়োগ করবে? বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পেছনে না ছুটে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। তারাই রাজস্ব আনে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জিডিপির মূল অংশ আসে স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগের অংশ এক শতাংশেরও কম। তাই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য মরিয়া হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা দেখলেই বোঝা যায় যে বেসরকারি বিনিয়োগ স্পষ্টভাবে কমে গেছে। আস্থা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আমার অফিসের কর্মীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম বিক্রি কেন কমে গেছে। তারা বলেছে, নির্বাচনের আগে মানুষ টাকা খরচ করতে চায় না। অর্থাৎ নির্মাণ খাত স্থবির হয়ে আছে, আর আমরা রড, সিমেন্টসহ এই খাতের অংশীদাররা সেই ধাক্কা সামলাচ্ছি।’
বাংলাদেশ-থাই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিটিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেক সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু এখনো সেগুলোর কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। এখন নীতি পরিবর্তন বন্ধ রেখে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা উচিত, যাতে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার এসে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।’
বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘পরবর্তী সরকার যেন কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে নিতে পারে, সে জন্য ব্যবসায়ী সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রশাসনিক ও শাসন কাঠামোর একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন প্রয়োজন; খণ্ডখণ্ড সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে ফল দেবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে বন্দর ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করার প্রযুক্তি ও নীতিগত সহায়তা রয়েছে। কিন্তু কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট বিভাগ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অনীহার কারণে ডিজিটাল প্রক্রিয়া পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।’
লুতফে সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে লজিস্টিকস ও রপ্তানি খাতের জন্য কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কারী থাকে। আমাদেরও তেমন কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সরকার প্রথমে টার্নওভার ট্যাক্সকে সমন্বয়যোগ্য হিসেবে চালু করেছিল, পরে সেটিকে অ-সমন্বয়যোগ্য করেছে যার ফলে ব্যবসা লাভ বা ক্ষতি যাই হোক, এটি এখন কার্যত ইনকাম ট্যাক্স হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এনবিআরের চেয়ারম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন এটি ব্যবসাবিরোধী নীতি, কিন্তু বলছেন তিনি কিছু করতে পারবেন না।’
আকিজ বশির গ্রুপের (বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা খুরশেদ আলম বলেন, ‘গ্যাসের মূল্যনীতি এমনভাবে করা হয়েছে যে নতুন কারখানাগুলোকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হয়, আর পুরনো কারখানাগুলো কম দামে পাচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা গ্লাস কারখানার জন্য মিসর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বালু আমদানি করি, অথচ দেশে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। আমাদের উচিত পরিবেশের ক্ষতি না করে দেশীয়ভাবে বালু উত্তোলনের উপায় বের করা।’
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জাহির বলেন, ‘যেসব ব্যাংক মালিক ঋণ নিয়ে টাকা পাচার করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে শেয়ার অবরুদ্ধ করতে হবে, যাতে তারা আর কখনো ব্যাংকের মালিক হতে না পারেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের সমাজে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে লুতফে সিদ্দিকী আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এখন পর্যন্ত ৫ লাখেরও বেশি সেবা দিয়েছে এবং ১২ লাখ অফিস ভিজিট কমিয়েছে। এ ছাড়া ই-গেট চালুর ফলে বন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সময় ২০ মিনিট থেকে নেমে ২০ সেকেন্ডে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি যখন সরকারে যোগ দিই, তখন সরকারি কর্মীদের অর্ধেক নিষিক্রয় ছিল এবং শ্রমিক অস্থিরতায় শিল্পাঞ্চল অস্থিতিশীল ছিল। ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় আমরা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছি।’
তিনি অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার মধ্যেও তারা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার পর মূল্যস্ফীতির চাপ স্বাভাবিক, কিন্তু আমরা তা স্থিতিশীল রাখতে পেরেছি।’
সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘আগে একটি বিষয়ের অনুমোদনের জন্য পাঁচটি দপ্তরের দরজা ঠেলতে হতো, এখন বেশিরভাগই এক বৈঠকেই সমাধান হয়। ব্যবসা করার সহজতার সূচকেও প্রায় ৪ শতাংশ উন্নতি হয়েছে। মাত্র এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কার অগ্রগতির ধারা নিয়ে বৈশ্বিক ধারণা বদলে গেছে।’