দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আদানির সঙ্গে করা অসম চুক্তি নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও স্বার্থবিরোধী চুক্তির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিও ওই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছে। ঠিক সেই সময়ে নিজের মতো দাবি করা বকেয়া বিল পরিশোধ না করলে আবারও বিদ্যুৎ বন্ধের আলটিমেটাম দিয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।
১০ নভেম্বরের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না হলে ১১ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদানি পাওয়ার লিমিটেড (এপিএল)। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্র ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে বাংলাদেশকে।
বিগত সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বকেয়া বিল আদায়ের জন্য এর আগেও একাধিকবার আলটিমেটাম দেওয়ার পাশাপাশি নানা কৌশলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং বন্ধও করেছিল আদানি। অন্তর্বর্তী সরকার পুরনো বকেয়া পরিশোধ করার পর কয়লার বাড়তি দাম নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় আদানির সঙ্গে।
এদিকে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে আদানি। তবে এতে রাজি নয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
পিডিবি বলছে, বিষয়টি বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকায় এখন সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু করলে সময় ও অর্থের অপচয় হবে। ফলে আদানি-বিপিডিবি সম্পর্কের চলমান টানাপড়েন এখন দুই দেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রমতে, যে অসম প্রক্রিয়ায় আদানির সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত করছে চুক্তি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। এরই মধ্যে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে তারা। মাসখানেকের মধ্যে আরও শক্ত প্রমাণ মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আদানির আলটিমেটাম : গত ৩১ অক্টোবর পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আদানি পাওয়ারের ভাইস চেয়ারম্যান অবিনাশ অনুরাগ অভিযোগ করেন, পিডিবি ৪৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে ২৬২ মিলিয়ন ডলারকে পিডিবি নিজেই ‘বিরোধহীন পাওনা’ হিসেবে স্বীকার করেছে।
চিঠিতে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ১৩.২ ধারায় বলা আছে, বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরবরাহ স্থগিতের অধিকার রাখে কোম্পানি। ১০ নভেম্বরের মধ্যে সব বকেয়া নিষ্পত্তি না হলে আমরা ১১ নভেম্বর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হব।’
গত বছর একবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছিল আদানি। এ ছাড়া একাধিকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
ভারতীয় কোম্পানিটি জানিয়েছে, সরবরাহ বন্ধ থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা’ ধরে সক্ষমতা চার্জ পাওয়ার অধিকার তারা রাখবে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলেও বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
আদানির বিদ্যুৎ বন্ধের আলটিমেটামের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধায় পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো তারা (আদানি) সবসময় দেয়। ঠিক আছে, দেখি আমরা কী করতে পারি।’
আপাতত মধ্যস্থতায় রাজি নয় পিডিবি : চলমান বিরোধ মেটাতে আদানির প্রস্তাবিত মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় আপাতত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিডিবি। গত ২ নভেম্বর সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্রের (এসআইএসি) রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এখনই মধ্যস্থতা শুরু করা অনুচিত। বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন।
চিঠিতে পিডিবির পরিচালক (কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন) প্রকৌশলী মকসুদুর রহমান ও সচিব রাশেদুল হক প্রধান স্বাক্ষর করেন। তারা জানায়, আদানি ৩০ অক্টোবরের চিঠিতে পিপিএর ধারা ১৯.৩(খ) অনুযায়ী, মধ্যস্থতা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পিডিবি বলছে, চুক্তির ধারা ১৯.৩ অনুসারে মধ্যস্থতা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। ধারা ১৯.৩ (ঘ) অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞের মতামত চূড়ান্ত নয় এবং যেকোনো পক্ষ চাইলে সালিশি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়, চুক্তিসংশ্লিষ্ট অনিয়ম, কমিশনবাণিজ্য ও জালিয়াতির অভিযোগ বর্তমানে হাইকোর্টের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তাধীন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তাই এখন মধ্যস্থতায় গেলে তা আদালতের নির্দেশনা ব্যাহত করতে পারে।
পিডিবি রেজিস্ট্রারকে অনুরোধ করে জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিশেষজ্ঞ নিয়োগ বা মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত নয়। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, পিডিবির আপত্তি উপেক্ষা করে যদি রেজিস্ট্রার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেন, তবে সেই খরচের দায়ভার আদানি বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকেই নিতে হবে।
অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় কমিটি : বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতের বিশেষ বিধান বা দায়মুক্তি আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে এ-সংক্রান্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। গত রবিবার তাদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন বিদ্যুৎ বিভাগে জমা দিয়েছে। যেখানে আদানির সঙ্গে চুক্তি নিয়েও নানান অসংগতি, অনিয়মের কথা রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বলেছে, আদানিসহ বড় বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোর অনেকটিতেই গুরুতর অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি ঘটেছে। দুর্নীতির কারণে বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ আর ভর্তুকি তুলে নিলে ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, আদানির চুক্তিতে যদি কোনোরকম অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে বাতিল করতে দ্বিধা করব না। তবে যথাযথ কারণ থাকতে হবে।
কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, আদানির চুক্তির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মাসখানেকের মধ্যে শক্ত প্রমাণ সামনে আসবে। এসব প্রমাণ নিয়ে দেশ-বিদেশে আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া যাবে।
চুক্তির পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা : গত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর পিডিবির সঙ্গে নিজেদের মতো করে একতরফা চুক্তি সই করে পিডিবি। ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যের গড্ডায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে আদানি, যার সব বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। এ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৫ বছর ধরে কিনবে বাংলাদেশ। গত সোমবার রাত ৮টায় কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছে বলে পিডিবি জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রমতে, আদানির চুক্তিতে কয়লার দাম নির্ধারণে বাংলাদেশের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, অন্য কেন্দ্রগুলোর তুলনায় প্রতি টন কয়লায় ১০ থেকে ১২ ডলার বেশি দিতে হচ্ছে, বছরে প্রায় ২০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করছে।
এরই মধ্যে আদানি পিডিবিকে তাদের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) নবায়নের জন্য চাপ দিচ্ছে। ২০১৭ সালের চুক্তির অধীনে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যু করা এলসি গত ৩০ অক্টোবর মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। আদানি বলছে, এলসি নবায়নে দেরি পিপিএর ১৩.২ ধারার লঙ্ঘন এবং চুক্তিভঙ্গজনিত ঘটনা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে আদানির সরবরাহ করা বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলেও খুব বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু বিদ্যুৎ বন্ধ করলেও তাদের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ঠিকই দিতে হবে। এটা দেশের জন্য বড় ক্ষতি।’
চুক্তিটিকে একতরফা ও অবৈধ আখ্যায়িত করে এ বিশেষজ্ঞ বলছেন, প্রতিযোগিতা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প তো এমনিতেই বাতিল হওয়ার কথা। উল্টো আদানির কাছে বাংলাদেশের ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত। আদানির বিরুদ্ধে ভারতেও পরিবেশের ক্ষতি করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তারা যদি আন্তর্জাতিক আদালতে যায়, তাহলে বাংলাদেশ জিতবে বলে আশা করেন তিনি।