প্রধান উপদেষ্টাকে ৮দলের স্মারকলিপি

সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে বাঁকা করা হবে : তাহের

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও ওই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করাসহ পাঁচ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল। স্মারকলিপি প্রদান শেষে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারির জোর দাবি জানিয়েছেন।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যদি এই ঐতিহাসিক সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব বা ষড়যন্ত্রের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে প্রধান উপদেষ্টা জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের যে মর্যাদা অর্জন করেছেন, তা নষ্ট করবেন।’

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর পল্টন মোড় থেকে দলগুলোর নেতাকর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হন। মিছিলে ‘পিআর ছাড়া নির্বাচন, মানি না মানব না’, ‘সংস্কার ছাড়া নির্বাচন, মানি না মানব না’, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, দিতে হবে দিয়ে দাও’, ‘গণভোটের তারিখ, দিতে হবে দিয়ে দাও’, ‘নভেম্বরে গণভোট, দিতে হবে দিয়ে দাও’ ইত্যাদি সেøাগান দেন নেতাকর্মীরা। মিছিলটি মৎস্য ভবন এলাকায় গেলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাতে বাধা দেয়। পরে জামায়াতসহ আট রাজনৈতিক দলের একটি প্রতিনিধিদল ৫ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিতে যমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এর আগে সকালে শাপলা চত্বর এলাকায় জড়ো হন জামায়াতসহ আট দলের নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে পল্টন মোড়ে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে দলগুলো।

সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছে। ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি চলে এসেছে, কিন্তু গণভোটের তারিখ ঘোষণা হচ্ছে না। নির্বাচনের আগে গণভোট দিতে হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করব।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও গণভোট করতে আইনি বাধা নেই। এ বিষয়ে সময়ক্ষেপণ অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপদে ফেলবে। সে ক্ষেত্রে নতুন পথ বেরিয়ে আসবে। অনেকে গণভোটের ক্ষেত্রে খরচের কথা বলেন। একদিনে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়, সেই টাকা দিয়ে একটা গণভোট করা যায়। তাই গণভোটে টাকার অভাব হবে না।’

তাহের বলেন, ‘জামায়াতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ, জামায়াত নির্বাচন, সমাধান, শান্তি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়। সরকারও দলগুলোকে আলোচনা করতে বলেছে। তবে সরকারকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে হবে। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য জামায়াত একটি কমিটি গঠন করেছে। অন্য দলগুলোও যাতে আলোচনার জন্য কমিটি গঠন করে। অবিলম্বে আলোচনা শুরু হোক। সময়ক্ষেপণ করা যাবে না।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

পরে আট দলের ৯ জন নেতা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দিতে যান। তারা হলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল বারী মাসউদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক মূসা, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম।

আটটি ইসলামি দলের দেওয়া স্মারকলিপি যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে গ্রহণ করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে ৭ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে অপেক্ষা করছে। এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’

 সেখান থেকে ফিরে মৎস্য ভবনের সামনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ১১ নভেম্বর আটটি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে রাজধানীতে মহাসমাবেশ হবে। ঢাকার মহাসমাবেশ লাখ লাখ জনতার পদভারে মুখর হওয়ার আগে সরকার যেন ৫ দফা দাবি মেনে নিয়ে জুলাই সনদের গণআকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তা না হলে ১১ নভেম্বর ঢাকার চিত্র ভিন্ন হবে। নেতারা যখন যমুনায় গেলেন, তখন প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক চলছিল। জামায়াতসহ অন্য দলগুলোর আবেদন ছিল, প্রধান উপদেষ্টা না হলেও একজন উপদেষ্টাকে তাদের কাছে পাঠাতে হবে। পরে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানকে পাঠানো হয়।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শিল্প উপদেষ্টা রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারের আন্তরিকতার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি এক সপ্তাহের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করে সরকারকে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা স্মরণ করে দিয়েছেন। আটটি দল এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতার কথা বলেছে। দলগুলোর এই আলোচনায় সরকারেরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে শিল্প উপদেষ্টাকে জানানো হয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি বলেন, আট দলের দাবিগুলো শিল্প উপদেষ্টাকে পড়ে শোনানো হয়েছে। তিনি দাবির প্রতি দ্বিমত করেননি। প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই স্মারকলিপি যথাযথ প্রক্রিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

জামায়াতসহ আট দলের দাবিগুলো হলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং ওই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করা; আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে বা উচ্চকক্ষে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি চালু করা; অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করা; ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের সব জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা এবং ‘স্বৈরাচারের দোসর’ জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।