বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্থানীয় উৎপাদনের ওপর ভরসা করতে চাইলেও পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। পণ্যটির উচ্চমূল্য ঠেকাতে আমদানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য মতে, ঢাকায় এখন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহখানেক আগেও ছিল ৮০ টাকার মধ্যে। এ হিসাবে সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৪০ টাকা বেড়েছে। আর এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত মৌসুমে ৩৯ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। কিন্তু দেশের উৎপাদিত পেঁয়াজের অন্তত ২৫ শতাংশ উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে ২৭-২৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে প্রতি বছরই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে পেঁয়াজ আমদানির সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেঁয়াজের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আমদানির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ে এবং এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এজন্য সীমিত পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির জন্য দ্রুত অনুমতি দিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশন বলছে, পেঁয়াজ আমদানি প্রধান উৎস দেশ ভারত। দেশটি থেকে পণ্যটির ৯৯ শতাংশই আমদানি হয়। এ ছাড়া তুরস্ক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন এবং মিসর থেকেও পেঁয়াজ আমদানি হয়। বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।
আমদানির সুপারিশের পেছনে কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছে ট্যারিফ কমিশন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, পেঁয়াজের উচ্চ দামের সুবিধা কৃষক পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরা এ সুযোগ নিচ্ছেন। তাই পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ দিলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে যাবে। ভোক্তারা যৌক্তিক মূল্যে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন।
সম্প্রতি বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে আমাদের বিভিন্ন সংস্থা মনিটরিং করছে। যে কারণে পাইকারী বাজারে দামও কমতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমরা পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি প্রদান করব না। আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ মাসেই ৮৭ হাজার টন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। ডিসেম্বরে অন্তত আড়াই লাখ টন পেঁয়াজ উঠবে। আবার সাড়ে তিন লাখ টন পেঁয়াজের মজুদ রয়েছে। সবমিলে আমরা আমদানি না করে নিজেদের সক্ষমতা দেখানোর চিন্তা করছি। আমদানি না করে যদি মৌসুম পার করা সম্ভব হয় তাহলে সবার কাছে একটা তথ্য পৌঁছাবে। এটাই আমরা চাচ্ছি।
জানা গেছে, পাইকারি বাজারে অল্প পরিমাণে পেঁয়াজের দাম কমলেও খুচরা পর্যায়ে গতকাল শনিবার ঢাকার বেশিরভাগ পাড়া-মহল্লায় ১২০ টাকা কেজি দরেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়।
এদিকে ব্যবসায়ী ও টিসিবির দেওয়া তথ্য বলছে, সবশেষ গত জুলাইয়ের শেষদিকে থেকে আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পেঁয়াজের দামে অস্থিরতা শুরু হয়। কয়েক মাস ৬০ থেকে ৬৫ টাকার স্থিতিশীল থাকার পর হঠাৎ করেই ৮০ থেকে ৯০ টাকায় উঠে যায়। এ পরিস্থিতিতে আগস্টের মাঝামাঝিতে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের জানান, বাজার স্থিতিশীল রাখতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। এ ঘোষণার পরই পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া শুরু হয়। এই আমদানির অনুমতি প্রদান করে সাধারণত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগ। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই বিভাগ আমদানি অনুমতি (আইপি) দেওয়া শুরু করে। তবে সেটা ছিল বেশ নিয়ন্ত্রিতভাবে। প্রতিটি আবেদনের ভিত্তিতে অল্প অল্প করে অনুমোদন দেওয়া শুরু করে। তবে এই আইপি প্রদানের সময়টা খুব বেশি সময় ধরে দেওয়া না হলেও পেঁয়াজের বাজার ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়য়ের নির্দেশনায় ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে আইপি (আমদানিপত্র) দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ১০ হাজার টন পেঁয়াজও আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি। সে সময় পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল হয়ে আসায় আইপি দেওয়া বন্ধ করে সরকার। কিন্তু আমদানিকারকরা অনেকেই পেঁয়াজের এলসি খুলে বেশি পরিমাণে এবং তা স্থলবন্দরগুলোতে এনে রাখে। কিন্তু আইপি না দেওয়ায় তা আর দেশে আসেনি। সেখান থেকেই ব্যবসায়ীরা একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সাম্প্রতিক সময়ের দুই-তিন দিনের বৃষ্টি তাদের সে সুযোগ এনে দেয় এবং বাজারে ব্যাপকহারে দাম বাড়ান ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে একটি গ্রুপ আমদানির অনুমতির জন্য ব্যাপকভাবে চাপ তৈরি করতে থাকে সরকারের ওপর।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সে সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা আইপি দেওয়া বন্ধ করার পর ব্যবসায়ীদের মৌখিকভাবেই আবেদন করতে বলেছিলেন। তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন আইপি দেওয়া হবে। সে সময় ২ হাজার ৮০০ আবেদন করেছিল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আর আইপি দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা অবশ্য হাইকোর্টে রিটও করেছিলেন, কিন্তু সেটা খারিজ হয়ে যায়।
এ অবস্থায় আগস্টের আদলে আরেক দফায় পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানকে জানিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। এই নভেম্বরেই অন্তত ৮৭ হাজার টন পেঁয়াজ বাজারে আসবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় নতুন পেঁয়াজ আসার কথা বললেও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় মন্থার প্রভাবে নভেম্বরের শুরুতেই দেশের নানাপ্রান্তে ভারী বৃষ্টিতে আমন ধান, পেঁয়াজসহ নানা ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকরা সেই ক্ষতি না সামলাতেই চলতি মাসে আরও দুই থেকে তিনটি নিম্নচাপের আশঙ্কা রয়েছে, যার একটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। ফলে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে কৃষকের মাঠে রয়েছে আলু, পেঁয়াজ ও আমন ধান। এই দুর্যোগ নেমে এলে তিনটি ফসলেরই ব্যাপক ক্ষতি হবে, যা ভোক্তার সারা বছরের ভোগান্তির কারণ হতে পারে।