জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ পাঁচ দফা দাবি আদায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দল রাজপথে যে কর্মসূচি পালন করছে, তার সমালোচনা করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘কথায় কথায় আপনি দাবি নিয়ে রাস্তায় যাবেন, সেটা হবে না। আপনাদের দাবি নিয়ে মাঠে যাবেন, এর বিপরীতে যদি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দল কর্মসূচি দেয়, তাহলে সংঘর্ষ বাধবে না?’
এদিকে বিএনপি নেতার এমন বক্তব্যের জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘জামায়াত কোনো প্রেশার গ্রুপ নয়, বরং জনগণের মতামত ও প্রত্যাশা প্রতিফলিত করতে রাজপথে রয়েছে। আমরা মতভিন্নতা মেনে অন্যদিকে নিতে পারি; কিন্তু মতবিরোধ চাই না।’
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘শাসনব্যবস্থা ও জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। সারা বিশ্বে সংবিধান-সংক্রান্ত বিতর্কে সময় লাগে, কখনো তা দশক ধরেও চলে। রাতারাতি কোনো সমাধান চাপিয়ে দেওয়া যায় না।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ট্রেস কনসাল্টিং আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণের আকাক্সক্ষা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত করতে পারে’ শীর্ষক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন। সংলাপে গণভোটের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সংবিধানের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছে, তারা এই সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়েছেন। এই সংবিধানে গণভোট নিয়ে কিছু নেই। আগামীতে নির্বাচনে পাস করে সংসদে গিয়ে সংবিধানে গণভোট যুক্ত করে এরপর গণভোটে আসতে পারে।’
এ সময় গণভোটের দাবি নিয়ে কথায় কথায় রাস্তায় না নামার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কথায় কথায় আপনি দাবি নিয়ে রাস্তায় যাবেন, সেটা হবে না। আপনাদের দাবি নিয়ে মাঠে যাবেন, এর বিপরীতে যদি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দল কর্মসূচি দেয়, তাহলে সংঘর্ষ বাধবে না?
খসরু বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেমন জানি একটা স্বৈরাচারী মনোভাব চলে আসছে। কনসাসের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের ৩১ দফার অনেক কিছুই কনসাসের মধ্যে আসেনি, তাই বলে কি আমি মাঠে নামব? আমি জনগণের কাছে যাব। ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। চ্যাপ্টার ক্লোজড। আপনার চিন্তাভাবনা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনি ক্ষমতায় আসেন, এরপর আপনি পরিবর্তন করুন।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে একটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে একটি দলের ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতাকর্মীদের অন্তর্কোন্দলের মাধ্যমে ঘটেছে। যারা নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে, তারা ঘটিয়েছে কি না এ ঘটনা সেটি আমাদের সন্দেহ।’
এ সময় বিএনপিকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘বিগত রেজিম কিন্তু এ রকম একটা স্বরূপ সবসময় বাজাত অমুকের সঙ্গে বসব, অমুকের সঙ্গে বসব না। সেই কালচার থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি না?’ তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনের জন্য গণভোট এজন্যই দরকার, সংস্কারের বিষয়গুলো আসলে কী আছে, জনগণকে জানতে হবে। কিছুটা হয়তো জনগণ জানে, গণভোটের মাধ্যমে আরও ব্যাপকভাবে জানার সুযোগ আছে। নির্বাচন কমিশন এটিকে প্রকাশ করবে এবং সরকার এটার জন্য প্রচারণা চালাবে। আমরা রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও অন্যান্য অংশীজন সবাই মিলে যদি মাঠে নামি, তাহলে জনগণ বুঝতে পারবে একটা গণভোট হচ্ছে।’
জামায়াত কেন আন্দোলনে গেছে, এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে উল্লেখ করে আযাদ বলেন, ‘এখানে ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, এজন্য আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি আগেও বলেছি, আমরা ডেমোক্রেটিক প্রসেসে আগাচ্ছি এবং আমরা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করছি জনমত তৈরি করার জন্য, আমরা প্রেশার গ্রুপ হয়ে কাজ করছি না। আমরা পাবলিকের কাছে যাচ্ছি, ভয়েস রেইজ করছি, সরকারকে আমরা কনভিন্স করার চেষ্টা করছি।’
বিএনপি মহাসচিবকে আহ্বান জানানো হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্য ওনারা রিপ্লাই দিয়েছেন জামায়াতের আহ্বানে সাড়া দেবেন না। আমি একটু আবদারের সুরে বলতে চাই, বিগত রেজিম কিন্তু এ রকম একটা স্বরূপ সবসময় বাজাত অমুকের সঙ্গে বসব, অমুকের সঙ্গে বসব না। সেই কালচার থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি না? আপনারা ডাকেন, আমরা যাব। বিএনপি যদি আহ্বান করে, জামায়াত অবশ্যই সবার আগে যাবে এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করবে। এ ধরনের উদারতার মনমানসিকতা আমাদের এখনো আছে। আমরা পজিটিভলি আগাচ্ছি, আমরা কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি, নির্বাচনের প্রতি থ্রেট হোক এ ধরনের কোনো কাজে আমরা নাই, ছিলামও না।’
সংলাপে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা ও জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। সারা বিশ্বে সংবিধান-সংক্রান্ত বিতর্কে সময় লাগে, কখনো তা দশক ধরেও চলে। রাতারাতি কোনো সমাধান চাপিয়ে দেওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত না নিতে পারে, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনিশ্চয়তা দূর করতে ম্যান্ডেট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে অন্তর্র্বর্তী সরকার।’
প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা এখন একটি ফ্র্যাকচারড পলিটিক্যাল সিচুয়েশন দেখছি। এখন ডান, বাম ও মধ্যপন্থি সব পক্ষের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক সমাধান প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘দেশে বর্তমান যে রাজনৈতিক বিরোধ চলছে, তা মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। এই সংকটের সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই হতে হবে। মাঠ দখল করে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।’