গণভোটের সিদ্ধান্ত এ সপ্তাহেই

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত বিরোধ নেই। তবে গণভোট অনুষ্ঠানের সময়সহ সনদের কিছু ইস্যুতে দলগুলো পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছে। সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়া ও গণভোট করে সনদ বাস্তবায়নের পথ খোলার বিষয়টি এখন প্রায় পুরোপুরি সরকারের ওপর বর্তেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে।

সনদ বাস্তবায়নের উপায় ও গণভোটের সময় নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে সরকারকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য দলগুলোকে সরকার যে অনুরোধ করেছে, তা আগামীকাল মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে। দলগুলোর কাছ থেকে সর্বসম্মত নির্দেশনা গতকাল রবিবার পর্যন্ত আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে আগামীকালই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য জামায়াতসহ কয়েকটি দল দাবি তুলছে।

এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে পাওয়া ইঙ্গিত অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টারা অনেকখানি এগিয়েছেন। তবে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়ার আগে সরকার আরও দু-একদিন রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের মতামতের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তও বিবেচনায় নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে কোনো মতামত না পেলে সরকার এ সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত জানাতে এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দেইনি। বলেছি, যত দ্রুত সম্ভব এবং সেটা এক সপ্তাহের মধ্যে হলে ভালো হয়। পাশাপাশি সরকারও এ নিয়ে কাজ করছে। আশা করছি শিগগির এর সমাধান হবে।’

বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোট চায়। আর জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট চায়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি আদেশ জারির মাধ্যমে সনদকে আইনি ভিত্তি দেবেন, যাতে গণভোটের কথা বলা থাকবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণভোট নির্বাচনের আগে হবে, না নির্বাচনের পরে হবে, সেই বিতর্ক করে কোনো লাভ নেই। গণভোট সংবিধানে নেই। এ জন্যে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। তাছাড়া আয়োজন সম্ভব হবে না।’ তিনি বলেন, গণভোটের সিদ্ধান্ত পুরোটাই সরকারের ওপর নির্ভর করছে।

জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫ বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক গণভোট অনুষ্ঠানের সময় ঘিরে। জানা গেছে, গণভোটের বিষয়ে বিরোধপূর্ণ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পেছনে সরকার, বিএনপি ও জামায়াতসহ রাজনৈতিক মহলে দুটি ধারণা কাজ করছে। বিএনপি মনে করছে, গণভোট হয়ে গেলে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলবে জামায়াত ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল। তাই বিএনপি গণভোটের বিরোধিতা না করলেও জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠানের কথা অবিরাম বলে চলেছে।

বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন যত দেরি হবে তাতে বিএনপির ঝুঁকি বাড়বে। এর সুবিধা পাবে জামায়াত, যারা পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজনীতি করে কিছুটা সুফল পেতে শুরু করেছে। নির্বাচন বিলম্বিত হলে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও সুবিধাজনক অবস্থায় আসার পথ খোঁজার সুযোগ পাবে। জামায়াতের এক্ষুনি ক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি, এমন বিবেচনা থেকে দলটির অনেক নেতা মনে করেন, নির্বাচন আর অন্তত এক বছর পিছিয়ে নিতে পারলে বিএনপির অসুবিধা বাড়বে। এতে জামায়াতের ক্ষমতায় আসার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সুযোগ মিলতে পারে। তাই এনসিপিকে সঙ্গে নিয়ে সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আগে করে নিতে চায় তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, গণভোট সেরে তাতে সনদ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট ‘হ্যাঁ’ ভোট নিতে পারলে সরকারও জাতীয় নির্বাচন পেছানোর মতো একটি কারণ দাঁড় করাতে পারবে। সেক্ষেত্রে সরকার জামায়াত ও এনসিপির সমর্থন পেতে পারে।

অন্যদিকে, বিএনপির চাওয়ার বিপরীতে গিয়ে আগে গণভোট করলে দলটি ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচার চালালে, তা সরকারের জন্য অনুকূল ফল বয়ে নাও আনতে পারে, এমনটাও মনে করছেন অনেকে। তারা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ইউনূস সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন অবস্থায় আগে গণভোট হলে, তার ওপর বিএনপির নেতিবাচক অবস্থানে আওয়ামী লীগ হাওয়া দিলে ‘না’ ভোটের পক্ষে জনরায় চলে যেতে পারে। এতে এতদিনের যতেœ তৈরি করা পুরো সনদ ও সংস্কার প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সরকারের ভেতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ ও নি¤œকক্ষের সদস্য নির্বাচনের জন্য ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ও গণভোটের দিনক্ষণের ওপর দলগুলোর চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার একটি ভারসাম্যমূলক পথ নিতে পারে। জামায়াতসহ আট দল চায় উভয়কক্ষে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের’ মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন। আর বিএনপি ও এনসিপি উচ্চকক্ষে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ মেনে নেবে, এমনটা বলা হচ্ছে। ভারসাম্য রেখে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার শক্ত অবস্থান নিতে পারে, এমনটা বলছেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা।

এ প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে তর্ক-বিতর্কের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য বেশি জরুরি। নিশ্চয়ই সেটি অনুধাবন করে এ ঐক্য সৃষ্টি করবে দলগুলো।