বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর জন্য আবারও চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। চিঠিতে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করতে চায় তারা। দাম বাড়ানোর জন্য এর আগে আরও দুবার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, গতকাল সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীরা ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা দিয়েছে। একই ধরনের প্রস্তাবনার বিপরীতে মাসখানেক আগে তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়। কারণ সরকারের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ঘটনা গত মাসের। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে একই প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দাম বেড়ে ১ হাজার ৬২ ডলার এবং পাম তেলের দাম বেড়ে ১ হাজার ৩৭ ডলারে উঠেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা মাসখানেক আগে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। এবারও ঠিক সেই প্রস্তাবনাটিই পুনরায় দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এই প্রস্তাবনা নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সমন্বিত সভা করার দরকার হলে সেটাও করা হবে। তবে যেহেতু প্রস্তাবনায় দামের পরিবর্তন হয়নি সেহেতু এর ওপরে নতুন করে ট্যারিফ কমিশনের বিশ্লেষণ দরকার হবে না। কারণ তারা এর ওপর আগে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছিলেন, সেটাই আমলে নেওয়া হবে।
ট্যারিফ কমিশনের পুরনো মূল্যায়ন এবং দাম বৃদ্ধির নতুন প্রস্তাবনাকে আমলে নিয়ে দাম নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন মাসখানেক আগে জানিয়েছেন ‘মূল্য সমন্বয়ের জন্য ট্যারিফ কমিশনের একটি ফর্মুলা ব্যবহার করে ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। ফর্মুলাটা ১৪ বছর আগের তৈরি করা, এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মানতে রাজি না।’
সে সময় বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, আইসিএমএবি (ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস) ও ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্টস অব বাংলাদেশকে (আইসিএবি) স্বতন্ত্রভাবে তেলের দাম বিশ্লেষণ (তেলের দাম) করতে দেওয়া হয়েছে। আইসিএমএবি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে রিপোর্ট প্রদান করলেও এখনো আইসিএবি-র এই রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। বাণিজ্য উপদেষ্টাও জানান, দুটি রিপোর্ট পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তেলের দাম বাড়বে না কমবে।
তবে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, আইসিএমএবির রিপোর্টটা আমরা পেয়েছি। তবে ঠিক যে বিশ্লেষণ আমরা আশা করেছিলাম, সেটা উঠে আসেনি। এটা মানসম্মত হয়নি। অন্যদিকে আইসিএবি-র রিপোর্টটা এখনো পাইনি।
জানা গেছে, গত অক্টোবরের ১৩ তারিখ বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তেলের দাম নির্ধারণের ঘোষণা করে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৬ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩ টাকা, ৫ লিটারের বোতলে ২৩ টাকা এবং প্রতি লিটার পাম অয়েলের দাম ১৩ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এই ঘোষণার পরপরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আপত্তি তুলে জানায়, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। পরের দিন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
জানা গেছে, এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে। সে সময় প্রথমবারের মতো ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাম বৃদ্ধির আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক সভা ও ট্যারিফ কমিশনের বিশ্লেষণের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সয়াবিন তেলের দাম সর্বোচ্চ ১ টাকা বাড়ানোর অনুমতি প্রদান করে। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি জানাতে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তাদের চাওয়া অনুযায়ী দাম বাড়াতে না পেরে এক টাকা বাড়ানোর ঘোষণাটি আর দেননি, বাজারে তেলের দামও বাড়াননি।
এর কিছুদিন পরই আবার দাম বাড়ানোর জন্য একই প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠান ব্যবসায়ীরা। দ্বিতীয় দফায় ঘটে ভিন্ন ঘটনা। বাণিজ্য সচিব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে একটি দাম চূড়ান্ত করেন। ব্যবসায়ীরা সে অনুযায়ী সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও তৈরি করেন। পরে যখন সচিব উপদেষ্টার কাছে নতুন দামের চূড়ান্ত অনুমোদন গ্রহণের জন্য যান, তখন উপদেষ্টা দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দেন। তবে উপদেষ্টা তেলের দাম বাড়ানোর অনুমোদন দেননি এমন খবর পাওয়ার পরই ব্যবসায়ীরা তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে দেন। এতেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের একটি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ১২ আগস্টের প্রথম ভাগে প্রতি লিটার পাম তেলের দাম ১৯ টাকা কমিয়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়। এরও আগে গত ১৩ এপ্রিল সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৬৯ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।