রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের কাছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতি সহায়তার জন্য বার্তা দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় আগত জাতিসংঘের মিশন, ইউএন-ওএইচআরএলএলএস-এর সঙ্গে পোশাক খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর এক কৌশলগত পরামর্শ সভা থেকে এ বার্তা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে ইউএন হাউজে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিরবিষয়ক এ সভা হয়। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সভায় বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান পোশাক শিল্পের পক্ষ থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার ও সহায়তার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য একটি সহযোগিতামূলক নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় আরও অংশ নিয়েছেন, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমইএ) চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) এর পরিচালক হোসেন মেহমুদ, বিজিএমইএ এর পরিচালক ফয়সাল সামাদ, সাবেক পরিচালক শরীফ জহির এবং বিজিএমইর সাবেক পরিচালক ও স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এফটিএ অ্যান্ড পিটিএ এর চেয়ারম্যান লুৎফে এম আইয়ুব।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একযোগে ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় এবং অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করছে। বিশেষত, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গ্যাসের মূল্য ২৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং এপ্রিল ২০২৫-এ ক্যাপটিভ ও শিল্প খাতে যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশের মতো উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক চাপ। খেলাপি ঋণ ২৭ শতাংশের ওপর বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, লজিস্টিকস ক্ষেত্রেও রপ্তানিকারকরা তীব্র চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। বন্দর কার্যক্রমে অস্বাভাবিক বিলম্ব ও অদক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অক্টোবর ২০২৫ এ একধাপে চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সড়কপথে পরিবহনে দীর্ঘ সময় ব্যয় শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিকন্তু, ২০২৩ সালে ৫৬ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি, ২০২৪ সালে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৯ শতাংশ করা এবং বিকল্প কোনো সহায়তার ব্যবস্থা না রেখেই ৬০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা হ্রাস রপ্তানিমুখী এই খাতটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে শিল্পকে এক অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বৈঠকে পোশাক রপ্তানিকারকরা একটি স্থিতিশীল ও সুচারু উত্তরণ নিশ্চিত করতে সরকার এবং উন্নয়ন অংশীদারদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশসমূহ পেশ করেন বিজিএমইএ সভাপতি।
এসবের মধ্যে স্বল্প-মেয়াদে রয়েছে ডব্লিউটিও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকল্প প্রণোদনা চালু, ব্যাংক সুদের হার হ্রাস, এবং ইডিএফ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ কমানো। একইসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং লজিস্টিকস অদক্ষতা (বন্দর ও শুল্ক) দূর করাও অত্যাবশ্যক। বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করতে স্বল্প-মেয়াদে ইইউ জিএসপি প্লাস অর্জন এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে এফটিএর আলোচনা দ্রুত শুরু করা অপরিহার্য। মধ্য-মেয়াদে সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ হ্রাস, দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ, এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পের কাঠামোগত ভিত্তি মজবুতকরণ।