বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি উঠলেও বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং কূটনৈতিকভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উত্তরণ পেছানোর জন্য কূটনৈতিকভাবে নিশ্চিতভাবে কোনো পথ নেই। তবে এর জন্য আবেদন করলেও স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে করতে বলছেন অনেকে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা চলছে। দেশের অর্থনীতিতেও অস্থিতিশীলতা চলছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়া ঠিক হবে না।
গত ৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) আয়োজনে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে সেমিনারে এমন মত দিয়েছেন অনেকে। চেম্বারের সভাপতি সাব্বির এ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি (লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি) থেকে উত্তরণ হওয়ার কথা।
বক্তারা বলেন, এলডিসি উত্তরণ পেছানো হলে পরিস্থিতি বিরূপ হতে পারে। তাতে বাংলাদেশের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। তবে ব্যবসায়ীসহ অনেকে মনে করেন, ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়া দরকার।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গ্র্যাজুয়েশন বাস্তবতা। আজ না করলেও তিন বছর পর হলেও করতে হবে। এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার প্রস্তুতি নেবে, ব্যবসায়ীরাও নেবেন। অর্থনীতিবিদরা আমাদের সহযোগিতা করবেন। সবার সহযোগিতায় প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে হবে। এমনটি করলে যদি গ্র্যাজুয়েশন না-ও পেছানো যায় দেশের শিল্প খুব বেশি আক্রান্ত হবে না। আমাদের এখন থেকেই পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যালোচনার জন্য জাতিসংঘের তিনজনের একটি দল এসেছে। প্রতিনিধিরা আমাদের গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করবেন। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদরাও আমাদের সঙ্গে বসবেন। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরও যেন আমাদের সুবিধাগুলো পাই সে জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া গ্র্যাজুয়েশনের পরও আমাদের আগের মতোই সুবিধা দেবে। তারা শুধু অরিজিনের বিষয়ে সুবিধা দেবে না বলেছে। আমরা এ বিষয়েও আলোচনা করব। দেশের কল্যাণে আমরা এসব করব।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়া ঠিক হবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা চলছে। দেশের অর্থনীতিতেও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর আমরা মুদ্রার অবমূল্যায়ন আটকাতে পারিনি। দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। আমদানি-বিনিয়োগ কমেছে।’
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের বিপক্ষে না। অনেকে বলছে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি না। আমরা প্রতিদিন প্রস্তুতি নিচ্ছি। আরও কিছু সময় পেলে আমাদের জন্য ভালো হবে। গত তিন মাস আমাদের রপ্তানি ঋণাত্মক। এ পরিস্থিতি থেকে কবে মুক্তি মিলবে সেটি আমরা জানি না।’
তবে গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর বিষয়ে ভিন্নমত দিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমরা এলডিসি অর্জন করেছি। বিভিন্ন মানদ-ে উন্নীত হওয়ার পর এটি পেয়েছি। আগেও একবার পেছানো হয়েছে। এর মধ্যে কতটা প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি? এখনো এক বছর সময় আছে। এর মধ্যে প্রস্তুতি নিলে অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব।’