কিছুদিন আগেই একটা জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর স্টেডিয়ামগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সবুজ টিলার গ্রিন গ্যালারি, লাল টালির ছাদে প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের ছোঁয়া, স্টেডিয়ামের চারপাশে সবুজ চা বাগান আর মাঠে মখমলের মতো ঘাসের গালিচা... সব মিলিয়ে সিলেট স্টেডিয়ামে পা রাখলে যে কেউ এই মাঠের প্রেমে পড়তে বাধ্য। অথচ এখানে টেস্ট খেলতে নামলেই যেন অদ্ভুত এক বৈকল্য পেয়ে বসে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। এই মাঠে ৪টা টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ, তার ভেতর ৩টিতেই হার এবং এর দুটো আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে! রবার্ট মুগাবে পরবর্তী জিম্বাবুয়ে নিজেদের টেস্ট মর্যাদা ধরে রাখতেই খাবি খাচ্ছে, আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরে আছে সূচনালগ্ন থেকেই, তাদের কাছেও এই বছরের শুরুতে সিলেটেই হেরে গেছে বাংলাদেশ। তাই একই মাঠে প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড হলেও নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার সিলেটে শুরু হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজের প্রথমটি। প্রায় মাসপাঁচেক পর টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। প্রস্তুতি বলতে জাতীয় ক্রিকেট লিগের দুটো রাউন্ডে খেলার সুযোগ আর দিন তিনেকের অনুশীলন। অন্যদিকে আইরিশরা এসেছে বেশ তৈরি হয়ে। দুবাইতে দিন সাতেকের ক্যাম্প, বাংলাদেশে এসে দিন তিনেকের অনুশীলন। আয়ারল্যান্ড অধিনায়ক অ্যান্ডি বলব্রাইন আক্ষেপ নিয়েই জানিয়েছেন তাদের দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না থাকায় ৫০ ওভারের ক্রিকেট দেখেই নির্বাচকরা টেস্টের জন্য দল গড়েন। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচকদের একটা মিল আছে। বাংলাদেশে অবশ্য প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দুটো টুর্নামেন্ট আছে, তবে নির্বাচকরা টেস্টের জন্য দল গড়তে সেসব যে দেখেন না! দেখলে কি মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনকে বাদ দিয়ে জাকের আলী অনিককে দলে নেওয়া হয়? সোমবারও সেন্টার উইকেটে জাকেরকে অনুশীলনে দেখা গেল সেই লেগ সাইডে উড়িয়ে মারা অনুশীলন করছেন। কুৎসিত হাস্যকর ডিফেন্স, ব্যাটের সঙ্গে পায়ের কয়েক গজের দূরত্ব, এতটা বাজে ডিফেন্স নিয়ে স্কুল দলেও সুযোগ পাওয়া কঠিন। দলের সঙ্গে মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের কাগজে কলমে এটাই শেষ অধ্যায়, তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। তবে নাজমুল হোসেন শান্ত যেভাবে টেস্ট অধিনায়কের পদে ফিরে এলেন, তাতে সালাহউদ্দিনের প্রত্যাবর্তনও কাউকে অবাক করবে না। মোহাম্মদ আশরাফুল দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ব্যাটিং কোচ হিসেবে এবং তাকে লম্বা সময় আলাপ করতে দেখা গেল তাইজুল ইসলামের সঙ্গে। এই বামহাতি স্পিনারকেই যদি ব্যাটিংয়ের জন্য ভরসা করতে হয়, তাহলে সিলেটে টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের ভাগ্য খুব একটা বদলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মুশফিকুর রহিম খেলতে নামছেন ৯৯তম টেস্ট, বাংলাদেশ ১৫৫তম। বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেক ২০০০ সালে, মুশফিকের ২০০৫ সালে। বলা যায় অভিষেকের পর বাংলাদেশের বেশিরভাগ টেস্টেই মুশফিক সুস্থ থাকলে খেলেছেন, শুধু ২০২২ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ছুটি নিয়েছিলেন পবিত্র হজ পালনের জন্য। মুশফিকের এই স্মরণীয় মুহূর্তটাই উদযাপনে রাঙাতে চান অধিনায়ক শান্ত, ‘খুবই এক্সাইটেড। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দুটো টেস্ট ম্যাচ সেলিব্রেট করতে চাই, উপভোগ করতে চাই সবাই মিলে একসঙ্গে’ বিশেষ করে ১০০তমটা যদি উনি সুস্থভাবে খেলতে পারেন, তাহলে ওই পাঁচটা দিন আমরা সবাই মিলে সেলিব্রেট করব এবং এবং পুরো পাঁচটা দিন খুব ভালোভাবে উপভোগ করতে চাই। খুবই আশাবাদী ইনশাআল্লাহ উনি সুস্থভাবে দুটো টেস্ট ম্যাচ খেলবেন।’
দেশের মাটিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম, দুই ভেন্যুতেই সেঞ্চুরি আছে মুশফিকের। সিলেটে ৩ টেস্টের ৬ ইনিংসে মাত্র ১৩১ রান, গড় ২১.৮৩ আর সর্বোচ্চ ইনিংসটা ৬৭ রানের। এই পরিসংখ্যান মুশফিকের সঙ্গে একদমই বেমানান, বিশেষ করে যেখানে ৩ ম্যাচের দুটোই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে; যে দলের বিপক্ষে তার গড় পঞ্চাশের বেশি এবং দুটো ডাবল সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্রিকেটার ও কোচদের মতে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে দক্ষ আর পরিশ্রমী ক্রিকেটারের নাম মুশফিক। সিলেটের মাঠে তার ব্যাটে এমন রানখরার একটা কারণ নিঃসন্দেহে উইকেট। বাড়তি বাউন্স ব্যাটসম্যানদের ভোগায়, সকালের শিশিরভেজা উইকেট পেসারদের দিকে বাড়িয়ে দেয় সহায়তার হাত। মিরপুর আর চট্টগ্রামে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানরা বাড়তি বাউন্সেই হন বিভ্রান্ত। যদিও এই মাঠে উইকেটশিকারির তালিকায় সবার ওপরে তাইজুল, তার উইকেট সংখ্যা ২৬ আর পরেই আছেন ১৯ উইকেট নেওয়া মেহেদী হাসান মিরাজ। শান্ত যদিও সম্ভাব্য একাদশের সমন্বয়ের কথা জানাননি, রসিকতা করে বলেছেন ‘আগামীকাল ৯টা-৫ থেকে ৯টা-১০ এর ভেতরে (টসের পর) পেয়ে যাবেন’, ধরে নেওয়া যায় ক্রমিক ব্যাটিং ব্যর্থতায় ভোগা বাংলাদেশ একজন পেসারের বদলে একাদশে একজন ব্যাটসম্যান বাড়াতে চাইবে। সেক্ষেত্রে জাকের আলী হয়তো চলে আসবেন একাদশে, অন্যদিকে আইরিশ অধিনায়ক বলেছেন এই কন্ডিশনে তারা ৩ সিমার আর ২ স্পিনার খেলাবেন। অধিনায়ক হিসেবে শান্ত আশা করছেন স্পোর্টিং উইকেটের। বোলাররা নিয়মিতই ২০ উইকেট তুলে নিচ্ছে ম্যাচে, ব্যাটসম্যানদের কাছে আরও ভালো কিছু প্রত্যাশা করেন শান্ত।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সিলেটে সেঞ্চুরি করার অভিজ্ঞতা আছে একমাত্র শান্তরই। যে ম্যাচটা ছিল টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে শান্তর অভিষেক ম্যাচ। এবারও তো বলা যায় তার দ্বিতীয় অভিষেক, প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের জায়গায় আয়ারল্যান্ড। এত মিলের ভিড়ে ফলটা কি মিলবে না!