সূত্রাপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারিক সাইফ মামুন (৫৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

সিনেমাটিক স্টাইলে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে দুই দুর্বৃত্ত গুলি করে হত্যা করেন মামুনকে। ৩ সেকেন্ডে ৬ রাউন্ড গুলি করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ফের আবারও গুলি করে। দুর্বৃত্তরা মামুনকে টার্গেট করে লাল একটি মোটরসাইকেল থেকে নেমেই গুলি করতে থাকে। মামুন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরাও দৌড়ে মামুনকে গুলি করে। দুর্বৃত্তদের মুখে ছিল মাস্ক, মাথায় ক্যাপ। দুজনের সঙ্গেই ছিল পিস্তল।

ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দায়িত্বরত একজন নিরাপত্তারক্ষী দেশ রূপান্তরকে বলেন, হত্যার শিকার ওই ব্যক্তি বেলা ১০টা ৫১ মিনিটের দিকে হাসপাতালের ফটক দিয়ে বের হন। প্রধান ফটক পার হয়ে একটু সামনে এগোনোর পর রাস্তা থেকে তার দিকে গুলি করে হামলাকারী দুইজন।

এরপর তিনি দৌড়ে আবার হাসপাতালের ফটকের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তখন মাস্ক পরিহিত দুই হামলাকারী সিনেমার কায়দায় হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে গুলি করতে করতে হাসপাতালে প্রধান ফটক থেকে একটু ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরে তারা কবি নজরুল কলেজের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জানা যায়, মামুনের বাবার নাম এস এম ইকবাল। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার মোবারক কলোনি এলাকায়। মামুনের স্ত্রী দাবি করেন তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। তবে পুলিশ বলছে, নিহত মামুন চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী। একসময় আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন মামুন। তবে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই কোন্দল থেকেই এই হত্যাকা- হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ফুলহাতা টিশার্ট পরিহিত মামুন দৌড়ে এসে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফটকের সামনে দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তখন মাস্কে মুখ ঢাকা এবং ক্যাপ পরা দুই যুবক পেছন দৌড়ে এসে পিস্তল দিয়ে একাধিক গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি ঘটে তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যে। গুলি করার পর দুই দুর্বৃত্ত দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন।

হাসপাতালের ওয়ার্ডমাস্টার মহিবুল্লাহ জানান, বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ হাসপাতালের সামনে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে শব্দ শুনে সবাই হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এসে সাইফ মামুন নামের ওই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন। প্রথমে তাকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে অবস্থার অবনতি হতে থাকলে সেখান থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মামুনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত মামুনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার বলেন, তিনি দুইদিন ধরে রাজধানীর বাড্ডার ভাড়া বাসায় ছিলেন। সোমবার সকালে একটি মামলায় আদালতে তার হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। এ জন্য তিনি সকালে বাসা থেকে বের হন। তিনি ধারণা করছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোকজন এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। এর আগেও ইমনের লোকজন মামুনকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

ঢামেক মর্গের সামনে মামুনের ভাগনে মাশরুফ বলেন, দুই বছর আগে জেল থেকে বের হয়েছিলেন। এরপর একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রত্যেকবার ব্যর্থ হয়। সোমবার সাক্ষ্য দিতে গেলে তাকে গুলি করে। হত্যার পর এখন সন্ত্রাসী ট্যাগিং দেওয়া হচ্ছে। জেল থেকে বের হয়ে মামুন কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। বিভিন্ন আড়তে কাঁচামাল সরবরাহ করতেন বলে দাবি করেন মামুনের ভাগনে মাশরুফ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, ‘গুলিতে নিহত ব্যক্তিটি শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন। তিনি কোনো ব্যবসায়ী নন। তিনি ইমন-মামুন গ্রুপের মামুন। তিনি এক সময় সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন। আমরা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। ছোট ছোট গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছি। এর বাইরে এখন আর কিছু বলতে পারছি না।’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানম-ি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। এই গ্রুপের ইমন বর্তমানে পলাতক। মামুন গতকাল মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে হত্যার শিকার হন।

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ২০ বছর সাজা খেটে ২০২৩ সালে কারামুক্ত হন মামুন। এর তিন মাসের মাথায় ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেসের সামনে তার ওপর হামলা চালায় আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগীরা। ওই হামলায় মামুন বেঁচে গেলেও মাথায় গুলি লেগে ভুবন চন্দ্র শীল নামে এক আইনজীবীর প্রাণ যায়।