পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে তারিক সাইফ মামুন (৫৫) হত্যার ঘটনায় দুই শুটারকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত শুটাররা হলেন রুবেল ও ইব্রাহিম। তারা দুজনই পেশাদার শুটার হিসেবে কাজ করেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রুবেল ও ইব্রাহিমকে কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই হত্যাকান্ড আকস্মিক নয়, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও এক গ্রুপ ছেড়ে অন্য গ্রুপে যোগ দেওয়ার প্রতিশোধ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বলি মামুন। হত্যায় যুক্ত থাকারা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা করে, সোর্স হিসেবে কাজ করেন মামুনের সঙ্গে থাকা লোকটিও।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মামুনকে হত্যার পরে দুর্বৃত্তরা দেশত্যাগ করতে সীমান্তে ঘুরপাক খান। পরিকল্পনা অনুসারে হত্যার পর যে সীমান্ত থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল তা ব্যর্থ হয়েছে। ফের কুমিল্লা সীমান্তে পাড়ি জমান তারা। সিসিটিভি ফুটেজে যে দুজনকে গুলি করতে দেখা গেছে তাদের শনাক্তও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা যায়, হত্যার পরিকল্পনায় ছিল দুর্বৃত্তদের ব্যাকআপ টিমও। যে দুজন দুর্বৃত্ত গুলি করেন তারা প্রথম ধাপে ব্যর্থ হলে পেছনে থাকা আরও দুজনের একটি ব্যাকআপ টিম প্রস্তুত ছিল। মামুনের সঙ্গে থাকা লোকটি ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সোর্স। মামুন কোথায় যান, কী করেন সেই বিষয়গুলোর তথ্য প্রদান করতেন তিনি। গত সোমবার সকালে একটি মামলার হাজিরা দিতে মামুন আদালতে আসবেন এমন তথ্য ইমনকে জানানোর পরই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় ২০ বছর সাজা খেটে ২০২৩ সালে কারামুক্ত হন মামুন। এরপরে ইমনের বাহিনী থেকে সরে পড়ে মামুন। গুঞ্জন ওঠে তোফায়েল আহমেদ জোসেফের সঙ্গে যোগ দেবেন মামুন। জোসেফের সঙ্গে যোগ দেওয়াই কাল হয়ে ওঠে মামুনের। একাধিকবার মামুনকে হত্যার চেষ্টা করেন ইমন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেসের সামনে তার ওপর হামলা চালায় ইমনের সহযোগীরা। ওই হামলায় মামুন বেঁচে গেলেও মাথায় গুলি লেগে ভুবন চন্দ্র শীল নামে এক আইনজীবীর প্রাণ যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মামুন কিলিং মিশনে ভূমিকা রেখেছে ‘ইব্রাহিম গ্রুপ’। নেতৃত্বে ছিল ইব্রাহিম, সানি, অনিক, পারভেজ, মাসুদ, নাজমুল, ভাইগ্না রনি ও কিলার কামাল। ইব্রাহিম বাহিনীর সদস্যরা ৫ আগস্টের পর থেকে ইমন গ্রুপের হয়ে কলাবাগান, ধানম-ি, রায়েরবাজার, জিগাতলা, মনেশ্বর রোড ও ট্যানারি পট্টি এলাকায় শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে আসছে। ফ্ল্যাট, জমি, আড়ত থেকে শুরু করে বাজার-দোকানসহ সব জায়গায় তাদের আধিপত্য। তাদের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস পান না।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। থানা-পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বিষয়টির ছায়া তদন্ত করছে। সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে তাদের শনাক্ত করা গেছে। দ্রুত সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামুন হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে দুই ব্যক্তি সরাসরি মামুনকে গুলি করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই চলছে। হত্যাকা-ের পেছনে কারা, কী কারণে, কার নির্দেশে হয়েছে এসব বিষয় আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।
উল্লেখ্য, সোমবার বেলা ১১টায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মামুনকে। ৩ সেকেন্ডে ৬ রাউন্ড গুলি করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ফের আবারও গুলি করা হয়। দুর্বৃত্তরা মামুনকে টার্গেট করে লাল একটি মোটরসাইকেল থেকে নেমেই গুলি করতে থাকে। মামুন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরাও দৌড়ে মামুনকে গুলি করে। দুর্বৃত্তদের মুখে ছিল মাস্ক, মাথায় ক্যাপ। দুজনের সঙ্গেই ছিল পিস্তল।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ফুলহাতা টি-শার্ট পরিহিত মামুন দৌড়ে এসে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফটকের সামনে দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তখন মাস্কে মুখ ঢাকা এবং ক্যাপ পরা দুই যুবক পেছন পেছন দৌড়ে এসে পিস্তল দিয়ে একাধিক গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি ঘটে তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যে। গুলি করার পর দুই দুর্বৃত্ত দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন।
এদিকে ঢাকার আদালত পাড়ার অদূরে দিনেদুপুরে এক আসামি হত্যাকা-ের পর আদালত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এ চিঠি পাঠান।
মামুনকে প্রকাশ্যে মেরে ফেলার কথা উল্লেখ করে পুলিশকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তিনি আদালতে একজন বিচারপ্রার্থী হিসেবে সংশ্লিষ্ট একটি আদালতে হাজিরা প্রদান করে বাড়ি ফেরার সময় কোর্ট আঙিনার পাশে তাকে হত্যা করা হয়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আদালত প্রাঙ্গণ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক।