৩ বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৪ হাজার কোটি টাকা লুট

প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গ্যাসসংকট জেনেও এসব প্রকল্প হাতে নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। এতে একদিকে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় বিপুল লোকসান হচ্ছে সরকারের।

বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ বেশ পুরনো। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে খুলনায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একটি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্প।

খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য এবং যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের জন্য এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল এমন অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পেড়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে কমিশনের পরিচালক মো. আবুল হাসনাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

দুদকের সূত্রমতে, অনুসন্ধান প্রায় শেষপর্যায়ে। এখন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ৩ নভেম্বর তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব প্রকল্পের অর্থব্যয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। শিগগিরই মামলার সুপারিশসহ কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গত রবিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরাও চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে দুদককে তথ্য দিয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।’

তিন প্রকল্পে যত ক্ষতি : প্রকল্প তিনটির মধ্যে পিডিবির ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বৈত জ্বালানির (গ্যাস ও ডিজেল) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও গ্যাসের অভাবে বেশিরভাগ সময় কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে গেলে মাঝেমধ্যে ডিজেল দিয়ে অল্প সময়ের জন্য কেন্দ্রটি চালানো হয়। সবচেয়ে ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বেশি সময় চালানোও যায় না। কেন্দ্রটি বন্ধ থাকলেও জনবল এবং আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় থেমে নেই। ফলে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে পিডিবির।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পিডিবির আটজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রকল্প পরিচালক ছিলেন দেওয়ান মো. ফজলুল করিম, যিনি বর্তমানে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত কর্ম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে গত রবি ও সোমবার একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

রবিবার দুপুরের পর তার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফজলুল করিম অফিসে নেই, সচিবালয়ে গেছেন। তাকে বিষয়বস্তু জানিয়ে ফজলুল করিমের বক্তব্য জানতে কথা বলার আগ্রহ পোষণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

খুলনায় অন্য যে দুটি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তার মালিকানায় রয়েছে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে ২০১৬ সালে ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কম্বাইন্ড সাইকেল বিদু্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। কিন্তু গ্যাসের অভাবে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলেও পিডিবিকে নিয়মিত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্র ভাড়ার নামে বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

একটি লোকসানি ও অযৌক্তিক প্রকল্পের পরও সেখানে আরেকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে ওই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে এখন চলছে কমিশনিংয়ের কাজ। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা সহসা নেই।

প্রকল্প পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশা করছি ফেব্রুয়ারির মধ্যে কমিশনিংয়ের কাজ শেষ হবে। দুই ইউনিটের কেন্দ্রটি চালাতে প্রতিদিন ১৩৫-১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বর্তমানে কারিগরি ত্রুটির কারণে ওই গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ কম ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। দুদকের তদন্তে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করছি। তারা তদন্ত করে দেখুক। আমরা এখানে কোনো কিছুই গোপন করছি কি না।’

খুলনায় বাড়তি গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা ক্ষীণ

বর্তমানে দেশে দৈনিক অন্তত ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। যদিও সরকারি হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০০ থেকে ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার মধ্যে আমদানি করা গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসসংকটে অন্যান্য পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিল্প-কারখানা থেকে বাসাবাড়ি সব খাতেই চলছে গ্যাসের হাহাকার। বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিবছর গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমছে। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগও আপাতত নেই। আবার এলএনজি আমদানির জন্য যে অবকাঠামো দরকার, সেটি নেই। এজন্য বিপুল অর্থব্যয়ের পাশাপাশি এটি সময়সাপেক্ষও। ফলে খুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিকল্প উপায় হিসেবে ভোলার গ্যাস সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ থেকে গ্যাস আনতে পাইপলাইন নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার। সেটি জোগাড় করার পর এই কাজ করতেও লাগবে কয়েক বছর। ফলে গ্যাস সরবরাহের দ্বিতীয় সুযোগটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর সে সময় পর্যন্ত ওই তিন বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকবে। কিন্তু সরকারকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ বিপুল লোকসান গুনতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় নির্মিত এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও সুদের ঘানি টানতে হবে বাংলাদেশকে।

অভিযোগ রয়েছে, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

ভোলা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়ন করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে খুলনা থেকে গ্যাসের পাইপলাইন যুক্ত করা হয়ে গেছে। তবে গ্যাস না থাকায় লাইন থাকলেও সেটা কাজে আসছে না। পরিকল্পনা ছিল ভোলা থেকে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন হবে। সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরে পরিকল্পনা হয়, ভারতের কোম্পানি এইচ এনার্জির মাধ্যমে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ করা হবে। শেষমেশ সেটিও করা সম্ভব হয়নি।

দুদক যা বলছে : নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির সত্যতা মিলেছে প্রাথমিক অনুসন্ধানে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। কমিশন পরে ব্যবস্থা নেবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সংস্থান যে হবে না তা প্রকল্প শুরুর আগে সম্ভাব্য যাচাইয়ের সময়ই দেখা উচিত ছিল। লুটপাটের উদ্দেশ্যেই বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি।