দেশের বিমানবন্দরগুলোয় চোরাচালান প্রভৃতি অপরাধে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অপরাধসংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা বেবিচক এবং বিমানের অন্য সব সংস্থার সদস্য। কয়েকজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। শনাক্তকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে বেবিচক।
শাহজালাল বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো হাউজ থেকে ৫৩টি অস্ত্র-মোবাইল ও বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলি গায়েব হওয়ার বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। গায়েব হওয়ার ঘটনায় তিনটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। যদিও তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে কথা বলছে না। এক আনসার সদস্য মোবাইল সরানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে। অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়, কাস্টম হাউজ ও বেবিচককে চিঠি দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সব বিমানবন্দরে গত পাঁচ বছরে সংঘটিত চোরাচালান, ঘুষগ্রহণ ও অন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তৈরি করছে বেবিচক। এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেবিচক, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, কাস্টমস, আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে চিঠি দিয়েছে বেবিচক। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বেবিচক কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চলে আসার দায়ে দেশে-বিদেশে সমালোচিত হচ্ছে বিমান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিমানবন্দর ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অস্ত্র-মোবাইল-গুলি গায়েব : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো হাউজ থেকে ১৫টি মোবাইল চুরি করার অপরাধে এক আনসার সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কার্গো হাউজে থাকা ৩৮টি অস্ত্র ও ১৫টি মোবাইল ফোন এবং এয়ারগানের বিপুল পরিমাণ গুলি খোয়া গেছে। তবে এ ঘটনা লুট নাকি চুরি সে বিষয়ে কেউ কথা বলছে না। বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের পর একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, এক লাখ গুলি ও ১৫টি মোবাইল সেট গায়েব হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে আমেরিকার তৈরি ১৬টি পিস্তল, তুরস্কের তৈরি ২০ হাজার রাউন্ড গুলি, ভারত ও জার্মানির তৈরি ২২টি এয়ার রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ বুলেট রয়েছে। এসব বিষয়ে তদন্ত কমিটি কাজ করছে।’
বিমানের দায়সারা চিঠি : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপক ও সিইও একটি চিঠি দিয়েছেন বেবিচকে ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কার্গো হাউজের স্ট্র্রং রুমে ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেছে। গত ২৮ অক্টোবর সকালে চুরির ঘটনা জানাজানি হলে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এ বিষয়ে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৬৭টি পিস্তল, ১২টি শটগান, একটি অ্যাসল্ট রাইফেল, ১৩৮টি পিস্তলের খালি ম্যাগজিন, ৯ মিমি ব্ল্যাংক কার্তুজ ৯৯১ পিস, শটগান ও রাইফেলের খালি ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়েছে। ২৯ অক্টোবর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমে রাখা আগ্নেয়াস্ত্রের ইনভেন্ট্রি করা হয়। পরে বিমানবন্দর থানা-পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্রগুলো হেফাজতে নেয়। তাছাড়া বিমান গত ২৫ অক্টোবর কাস্টম হাউজকেও একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সের প্রধান গুদাম-১-এর স্ট্রং রুমে রাখা মালামালের ইনভেন্ট্রি যথানিয়মে সম্পন্ন হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর স্পর্শকাতর ও নাজুক স্ট্রং রুমে ইনভেন্ট্রিকৃত মূল্যবান মালামাল রাখা সমীচীন হবে না। মালামাল সুরক্ষার জন্য কাস্টম হেফাজতে নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্গো হাউজ থেকে আসলেই কোনো জিনিস চুরি হয়েছে কি না তা আমরা গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখছি। অস্ত্র ও সোনা চুরি বা গায়েব হওয়ার বিষয়টিও আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না। তারপরও তদন্ত কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে।’
সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে : দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করার জন্য কয়েক মাস ধরে কাজ চলছে। গত পাঁচ বছরের যাবতীয় তথ্য, ভিডিও ফুটেজ, অভিযোগপত্র, শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিমানসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর স্থানে দায়িত্বে থেকে চোরাচালান, মানব পাচার, মুদ্রা পাচার এবং ঘুষগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বেবিচকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে বিমানবন্দরে যতগুলো বড় চোরাচালানের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগই অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা পেয়েছে। আমরা তাদের শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করছি। প্রাথমিকভাবে ৩০ জনের নাম পাওয়া গেছে, তবে তদন্ত শেষ হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।’
বদলি করলেও অপকর্ম থেমে নেই : বেবিচকের তদন্তে দেখা গেছে, অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি বা বদলির মাধ্যমে স্থান বদল করলেও তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ধারা অব্যাহত ছিল। এবার তাদের সম্পূর্ণ রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে। সিন্ডিকেট লাগেজ ছাড়ের নামে প্রবাসী যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি পণ্যের চোরাচালানেও সম্পৃক্ত। কার্গো টার্মিনালে কর্মরতরা ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ পণ্যের ছাড় দেন।
দুদকের শরণাপন্ন বেবিচক : বেবিচকসূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে শনাক্তকৃত কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির পরিমাণ ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। তাদের বিদেশ ভ্রমণে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়াও চলছে। বিমানবন্দরে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যারা সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছিল, এবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। আগে তদন্ত হলেও ফল পাওয়া যায়নি। এবার কর্তৃপক্ষ সত্যিই কঠোর। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, চাকরিচ্যুতি এবং প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিমানবন্দরে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন এমন এক প্রবাসী জানিয়েছেন, ‘তদন্ত যদি সত্যিই ফলপ্রসূ হয় তাহলে যাত্রীদের কষ্ট কিছুটা কমবে।’
বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দুর্বল : পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল আখ্যা দিয়ে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না। চোরাকারবারিরা সোনা পাচারে নয়া নয়া কৌশল অবলম্বন করছে। জুতা, বেল্ট, কোমরবন্ধনি, শার্টের কলার, স্যান্ডেল, সাবানের কেস, সাউন্ড বক্স, হুইলচেয়ার, ওষুধের কৌটা, খাবারের প্যাকেট, মানিব্যাগ, এমনকি সোনা গুঁড়া করে কাপড়ের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের ভেতরে রেখে পাচার করছে। স্ক্যানার ও নিরাপত্তাকর্মীদের নজর এড়াতে সোনার ওপর কালো ও সিলভারের প্রলেপও দেওয়া হচ্ছে।