ব্রাশফায়ারের বার্তা ফাঁসে অস্বস্তিতে সিএমপি

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. হাসিব আজিজের ওয়্যারলেস বার্তা বারবার ফাঁস হওয়ায় বিপাকে পড়েছে নগর পুলিশ কর্র্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দুপুরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র এসএমজি দিয়ে ‘ব্রাশফায়ারে’ হত্যার নির্দেশ দেন কমিশনার। সিএমপির চার জোন, থানা ও টহল টিমের উদ্দেশ্যে প্রেরিত এ বার্তাটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এর আগে আগস্ট মাসেও এমন একটি বার্তা ফাঁস হয়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে দেখা দিয়েছে গভীর অবিশ্বাস। অনেক সদস্য এখন সহকর্মীদের প্রতিই সন্দেহ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনারের ওয়্যারলেস বার্তা শুধু সিএমপির অভ্যন্তরীণ চ্যানেলে সীমাবদ্ধ থাকে। এটি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রেকর্ড করে বাইরে সরবরাহ করছে। এতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন। কমিশনার স্যার নিজেও বিব্রত।’

তারা আরও জানান, মঙ্গলবারের বার্তা ফাঁসের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে কমিশনারের দপ্তর থেকেই বিষয়টি তদারকি করছে।

এর আগে গত ১২ আগস্ট কমিশনারের আরেকটি বার্তা, ‘অস্ত্রধারী দেখামাত্র গুলি চালাতে হবে’ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ঘটনায় খুলশী থানায় প্রেষণে কর্মরত টেলিকম ইউনিটের কনস্টেবল অমি দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমের কাছে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, ‘পুলিশের অভ্যন্তরীণ বার্তা জনসমক্ষে আসা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, এটি নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ কাজ করছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। মাঠে অপারেশন চলাকালে আমার বার্তা ফাঁস হলে অপরাধীরা আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে, পাল্টা হামলা চালাতে পারে।’

সিএমপির কর্মকর্তারা জানান, কমিশনারের এ ধরনের বার্তা তাৎক্ষণিক অভিযান, নিরাপত্তা কৌশল কিংবা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে। এসব বার্তা আগেভাগে ফাঁস হলে অভিযানের গোপনীয়তা ভেস্তে যায়, পুলিশ সদস্যদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে এবং অপরাধীরা সতর্ক হয়ে পালিয়ে যেতে পারে।

গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত কয়েক দফায় ওয়্যারলেস সেটে কমিশনার বলেন, ‘শটগান হবে না, চায়না রাইফেলও বাদ। এখন এসএমজি ব্রাস্টফায়ার মোডে থাকবে। আমরা করছি চালিতাতলী-বায়েজিদে কুখ্যাত সন্ত্রাসী যারা লোক মারল, তাদের ঠেকানোর জন্য। সাজ্জাদ বাহিনী, ইয়াসিন বাহিনী, বার্মা সাইফুল, যারা কথায় কথায় মানুষ মারে, তাদের জন্য এসএমজি ব্রাস্টফায়ার মোডে থাকবে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে।’

এদিকে, নগরে গত কয়েক মাস ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছে তীব্র অস্থিরতা। একের পর এক খুনোখুনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বড় প্রশ্নবোধক তৈরি করেছে। সবশেষ গত ৫ নভেম্বর চালিতাতলীর খন্দকারপাড়ায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগ চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও ১৫ মামলার আসামি সরোয়ার হোসেন বাবলা। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ আরও দুজন। এর আগে ২৮ অক্টোবর রাতে বাকলিয়ার বগার বিলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন, আহত হন ১৫ জন। গত ২৫ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর। এসব হত্যাকাণ্ডে হাতেগোনা কয়েকজন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলেও মূল অস্ত্রবাজরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একের পর এক খুনের ঘটনায় গোয়েন্দা নজরদারি এবং সন্ত্রাস দমনে পুলিশের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গতকাল বিকেলে কমিশনার হাসিব আজিজকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সিএমপির মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনার স্যারের ফাঁস হওয়া ওয়্যারলেস বার্তা সম্পর্কে আমি অবগত নই।’