মানবতাবিরোধী অপরাধ

শেখ হাসিনার মামলার রায়ের দিন ধার্য আজ

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অভিযুক্ত ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির রায়ের তারিখ জানা যাবে আজ বৃহস্পতিবার। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ের দিন ধার্য করবে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। শেখ হাসিনা ছাড়া মামলার অপর দুই আসামি হলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। এর মধ্যে মামুন এ মামলায় অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এদিকে আজ শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ধার্যকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ লকডাউন কর্মসূচি দিয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশকিছু বাস পোড়ানো, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা এড়াতে সারা দেশে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় পুলিশ ও বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। গণআন্দোলন দমাতে ১ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা ও ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গুলি ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর উদ্যোগ নেয়। গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে এই প্রথম কোনো মামলার রায়ের পর্যায়ে এসেছে।

শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দমনে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা, নির্দেশ প্রদান, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ জনকে হত্যা, সাভারের আশুলিয়ায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় ৫ অভিযোগ আনা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে প্রসিকিউশন তাকে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘সুপ্রিম কমান্ডার’ হিসেবে তার চরম দণ্ডের দাবি করেছে।

এর আগে গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের শুনানি ও সমাপনী বক্তব্য শেষে রায়ের তারিখ ধার্যের জন্য ১৩ নভেম্বর (আজ) দিন ধার্য করে। ওই দিন শুনানির সমাপনী দিনে আদালতে বক্তব্য তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ভুক্তভোগীদের প্রতি ন্যায়বিচারের আবেদন জানিয়ে মামলার আসামি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের আরজি জানান। এদিন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামও শেখ হাসিনার ফাঁসির আরজি জানান। ওইদিন সমাপনী শুনানিতে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন ন্যায়বিচারের আরজি জানিয়ে আসামিদের খালাসের আবেদন করেন।

এ মামলায় গত ১০ জুলাই প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। গত ১২ মে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। শুনানির পর ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। গত ১৬ জুন ট্রাইব্যুনাল এক আদেশে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়। তবে, দুজনের কেউই ট্রাইব্যুনালে হাজির কিংবা আত্মসমর্পণ করেননি।

গত ৩ আগস্ট এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ, প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ওইদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন গণআন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে মুখাবয়ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খোকন চন্দ্র বর্মণ। গত ৮ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। শেখ হাসিনাসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের অন্যতম এ মামলার আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য হয়নি।

বিচার বাধাগ্রস্তের প্রচেষ্টা চলছে : প্রসিকিউশন

শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ধার্যকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিচার বাধাগ্রস্তের চেষ্টা ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। গতকাল ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ওনারা (আওয়ামী লীগ) জাতিসংঘে একটি আবেদন করে বলেছেন যে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। কেন পরিচালিত হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনটি করেছিলেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইনটি সংশোধন করা হয় এবং ২০১০ সালে এই ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছিলেন। এখন তাদের তৈরি করা আইন, আসামির অনুপস্থিতিতে কীভাবে বিচার চলবে, সেই প্রক্রিয়াটা তো তারাই তৈরি করেছেন। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিচার প্রক্রিয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, এখানে অনিয়ম কি হচ্ছে সেটা যদি ধরাতে হয় তাহলে আসামিকে উপস্থিত হতে হবে। উপস্থিত হয়ে আবেদন করে বলতে হবে যে, এখানে এই এই অনিয়ম হচ্ছে। পলাতক আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার (রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী) ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির এখানে কথা বলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসিকিউটর মিজানুল বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) পক্ষে যে স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার (অ্যাডভোকেট আমির হোসেন) নিযুক্ত করা হয়েছে, আমি যতটুকু জানি, উনি (আমির হোসেন) শেখ হাসিনার আমলের কোনো একটা আদালতের স্পেশাল পিপি ছিলেন। অর্থাৎ উনি তারই (শেখ হাসিনা) লোক ছিলেন।’ বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা থ্রেট টু জাস্টিস (বিচারের প্রতি হুমকি) কি না, এমন প্রশ্নে অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘থ্রেট টু জাস্টিস মনে করি না। তবে, এই বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য এগুলো করছে।’ রায়ের তারিখ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রায় দেওয়া, রায়ের দিন ধার্য করার এখতিয়ার পুরোপুরি ট্রাইব্যুনালের। তবে, আমরা বিশ্বাস করি যে, আগামীকাল (আজ) রায়ের তারিখ আমরা পাচ্ছি।’

ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সেনা মোতায়েন চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি : এদিকে আজ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সেনা মোতায়েন চেয়ে গতকাল সেনা সদর দপ্তরে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সেনা মোতায়েন চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিস থেকে সেনা সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’