কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আজ বৃহস্পতিবার দলটি ঢাকাসহ সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে তারা। যানবাহনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করছে। আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। রাজনীতিতে উত্তপ্ত ছড়ানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবারও যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। ঢাকা বিবশ^বিদ্যালয়ের টিএসসিতে ককটেল ছোড়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাপা আতঙ্ক। প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকলেও জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তরসহ সব ইউনিটে কয়েক দিন ধরে সিরিজ বৈঠক হয়েছে। অসুস্থতা ছাড়া পুলিশের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে গতকাল রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রো কমিশনার ও জেলার এসপিদের বার্তা পাঠিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা ঠেকাতে অ্যাকশনে যেতে বলা হয়েছে। ঢাকার চারপাশে কঠোর বেষ্টনী গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট অনুসারী ও কথিত দুর্বৃত্তরা কয়েক দিন ধরে বেশ কিছু স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে চোরাগোপ্তা হামলা করছে বলে দাবি করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, দুষ্কৃতকারীরা ঢাকাসহ সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারা বেশ কিছু স্থাপনার ভেতরে-বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহতও হচ্ছে মানুষ।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে বিশৃঙ্খলা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। জনগণ এখন নির্বাচনমুখী। আওয়ামী লীগ দেশের পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করছে। এসবের বিরুদ্ধে পুলিশ অ্যাকশনে যাবে। সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশে সিরিজ বৈঠক : পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট ঘটনার পর বড় ধরনের হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। তারপরও নাশকতাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, নাশকতার আশঙ্কায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে আগাম তথ্য পাচ্ছে না গোয়েন্দারা। অপরাধীরা সুবিধাজনক স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ করছে। গতকাল পুলিশ সদর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) শীর্ষ কর্তারা সিরিজ বৈঠক করেছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার আলাদাভাবে বৈঠক করেছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী রাস্তায় টহল দিচ্ছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের সব ইউনিটে দিকনির্দেশনা দিয়ে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠকে উপস্থিত থাকা ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লকডাউন কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। তারা আগুন-সন্ত্রাস চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তারা চোরাগোপ্তা হামলা চালাবে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এসব প্রতিরোধ করতে আমরা কঠোর অবস্থানে থাকব। রাস্তায় টহল বাড়ানোর পাশাপাশি যানবাহন ও পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার ভেতর ও প্রবেশপথগুলোতে বুধবার রাত থেকেই কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রবেশপথ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে জমায়েত ঠেকাতে কাউকে দাঁড়াতেই দেওয়া হবে না। গাবতলী, উত্তরার অদূরে টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ী-শ্যামপুর, পোস্তগোলা, সদরঘাট, বসিলা- মোহাম্মদপুর ও কেরানীগঞ্জে বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে বিস্ফোরক এবং অস্ত্র যাতে আসতে না পারে, সেজন্য কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।’
যানবাহনে আগুনে উদ্বেগ : পুলিশসূত্র জানায়, সাম্প্রতিক হামলা ও আগুন-সন্ত্রাসের পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বেশি। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ ও আলামত পাওয়ার পর পুলিশ বলছে, তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সারা দেশে নৈরাজ্যে জড়িত। ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে গঠিত বিশেষ সেল জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি (এনসিএসএ) কাজ শুরু করেছে। গত চার দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ছাড়াও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। গত শনিবার থেকে বুধবার রাত পর্যন্ত রাজধানীতে ১৪টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে ভেতরে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে মারা গেছেন বাসটির চালক।
তিনটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না। আমরা সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছি। রেলপথসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। অসুস্থতা ছাড়া সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকার সব থানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন : সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের ককটেল বিস্ফোরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থানে বোমা ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপির ৫০টি থানায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি থানার সামনে ১০-১২ জন করে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। টহলের পাশাপাশি পুলিশের চেকপোস্টও বাড়ানো হয়েছে।
৩২ নম্বরে অন্যরকম নিরাপত্তা : মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের গার্লস শাখায় পেট্রোলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। যদিও এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। গতকাল মিরপুর ও দোলাইরপাড়ে দুটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। উত্তরায় একটি মাইক্রোবাস ও রমনায় পুলিশের একটি গাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়সহ সরকারি অফিসগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য টহল দিচ্ছেন। পুলিশ, র্যাব, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করছেন। ধানম-ি ৩২ নম্বর এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতার ঘটনা যেন না ঘটতে পারে, সেজন্য সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে।
হোটেল-মেসে অভিযান : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতের অভিযানে আওয়ামী লীগের ৪৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগ পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও কয়েকজনকে আটক করে। মঙ্গলবার রাতেই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ফকিরাপুল, কাকরাইল, এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা যাচাই করতে মোবাইল ফোনও তল্লাশি করা হচ্ছে।
রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা হোটেল ও মেসে অভিযান চালাচ্ছি। কলাবাগানের একটি মেস থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা নাশকতার পরিকল্পনায় ঢাকায় এসেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেনা মোতায়েন চেয়ে চিঠি : শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আজ রায়ের দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ট্রাইব্যুনালে সেনা মোতায়েন চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে সেনা সদরে।
৫০০ টাকায় স্লোগান দিচ্ছে রিকশাওয়ালা : ঢাকা মহানগর পুলিশের (মিডিয়া) উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী যারা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ করে শহরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করে আমরা গ্রেপ্তার করছি। যারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, ইন্ধন দিচ্ছে, অর্থ সহায়তা দিচ্ছে তাদেরও আমরা আইনের আওতায় আনছি।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘যারা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি বা অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে, তাদের আইনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে দমন করা হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা বিভিন্ন উসকানি ও নির্দেশনা দিচ্ছে, তাদের বিষয়ে ডিবি সতর্ক রয়েছে। একজন নিরীহ রিকশাওয়ালাকে ৫০০ টাকা দিয়ে স্লোগান দিতে বলা হয়েছে, পরে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তল্লাশিচৌকি ও মোবাইল টহল : পুলিশ জানিায়েছে, লকডাউন ও অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে থাকছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা। বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিদেরও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার প্রবেশপথসহ প্রায় প্রতিটি বড় রাস্তায় বসানো হয়েছে বাড়তি চেকপোস্ট। নির্বাচন নিয়ে গুজব ঠেকাতে কঠোর মনিটরিং চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে।
আ.লীগের নিষিদ্ধ কার্যক্রমে অর্থ জোগানদাতাদের খোঁজা হচ্ছে : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে মাথাপিছু দেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর হঠাৎ রাজধানীর সড়ক কিংবা দেশের অন্য কোনো স্থানে দেখা যায় কর্মী-সমর্থকদের ঝটিকা মিছিল। মিছিল ছাড়াও গুপ্তভাবে ককটেল বিস্ফোরণ ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বাসে আগুন দেওয়া হচ্ছে। ঝটিকা মিছিলে অংশ নেওয়ায় গত ১০ মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। মিছিলের জন্য যারা টাকা দিচ্ছে, খুঁজে বের করা হবে তাদেরও।
রেলওয়ের সব স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ : রেলওয়ের সব স্টেশন, ট্রেন ও স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গতকাল রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফাতেমা-তুজ- জোহরা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। আদেশে বলা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীদের সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।