শেখ হাসিনার মামলার রায় ১৭ নভেম্বর

গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায় হতে যাচ্ছে আগামী ১৭ নভেম্বও সোমবার। আর সে রায়টি হবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলায়। তিনি জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রধান আসামি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ের জন্য এদিন ধার্য করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার আরও দুই আসামি হলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। এর মধ্যে মামুন দোষ স্বীকার করে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। গতকাল দুপুর

১২টার দিকে তাকে ট্রাইব্যুনালের ডকে হাজির করা হয়। গত আগস্টের শুরুর দিকে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি ও সমাপনী বক্তব্য শেষ হলে রায়ের তারিখ ধার্যের জন্য ১৩ নভেম্বর (গতকাল) দিন ধার্য করে আদালত। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন দেশজুড়ে চলছিল নানা উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ। আওয়ামী লীগ ‘লকডাউন’র ঘোষণা দেয়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশকিছু বাস পোড়ানো, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় বাসে দেওয়ায় আগুনে পুড়ে এক চালকের মৃত্যু, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রাজধানী জুড়ে ছিল থমথমে পরিস্থিতি। গণপরিবহন ও অন্যান্য যান যেমন কম ছিল তেমনি মানুষের চলাচল ছিল তুলনামূলক কম। শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ধার্যকে কেন্দ্র করে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএনের সদস্যরা ট্রাইব্যুনাল এলাকায় ছিলেন সতর্ক অবস্থানে।

দুপুর ১২টার কিছু পরে ট্রাইব্যুনালের দৈনন্দিন কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আদালতের উদ্দেশে মামলার নম্বর উল্লেখ করে বলেন, এ মামলায় আজকে রায়ের তারিখ ধার্যের জন্য নির্ধারিত আছে। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেন, এই মামলার রায় ঘোষণা হবে সোমবার ১৭ নভেম্বর।

দৃষ্টান্তমূলক রায়ের প্রত্যাশা প্রসিকিউশনের : আদালত থেকে বেরিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী ১৭ নভেম্বর এই মামলাটির রায় ঘোষিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, যারাই বাংলাদেশে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি কেউ অপরাধ করে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তবে তাদের সঠিক পন্থায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তাদের আইন অনুযায়ী যে প্রাপ্য, সেটা তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেই প্রক্রিয়ায় আমরা দীর্ঘ একটি যাত্রা শেষ করে এখন চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছি।’

অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আশা করছি, ১৭ নভেম্বর আদালত তার সুবিবেচনা ও প্রজ্ঞা প্রয়োগ করবে এবং এই জাতির বিচারের জন্য যে আকাক্সক্ষা ও তৃষ্ণা, সেটার প্রতি তারা সুবিচার করবেন এবং একটি সঠিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটা ইতি ঘটাবে এবং ভবিষ্যতে এই রায়টি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে তেমন রায় আমরা প্রত্যাশা করছি।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগে সর্বোচ্চ শাস্তি আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছি। আদালত তার সুবিবেচনা প্রয়োগ করবেন। আমাদের প্রার্থনা হচ্ছে এই অপরাধের দায়ে আসামিদের যেন সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়।’ ১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে নাশকতামূলক কর্মকা-ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরাসরি কেউ যদি বিচার প্রক্রিয়াকে বানচালের জন্য কোনো হুমকি দেন, কোনো কার্যক্রম করেন, অবশ্যই এটি আদালতের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল।’ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা আশা করছি যা কিছু বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে সেগুলোর কোনো প্রভাব কোনোকিছুতে পড়বে না। সবকিছু সাবলীলভাবে হবে।’

বিশ্বাস করি আসামিরা খালাস পাবেন : শেখ হাসিনার আইনজীবী : বিচারের শুরু থেকেই শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক দেখিয়ে বিচার কার্যক্রম শেষ হয়। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শুনানি করেন। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি যে সব জবানবন্দি (সাক্ষীদের) হয়েছে, জেরার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময় আমি বিভিন্ন রকমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আনতে সক্ষম হয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে সেসব জায়গায় আমি কন্ট্রোভার্সি ক্রিয়েট করার চেষ্টা করেছি। দালিলিক সাক্ষ্যের ওপরও কন্ট্রোভার্সি ক্রিয়েট করেছি। আমি বিশ্বাস করি, আসামিরা খালাস পাবেন।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়ায় আমার দেখা মতে কোনো অস্বচ্ছতা আমি দেখিনি। কারণ আমার ওপর কেউ কোনো চাপ প্রয়োগ করেনি। আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলনা। আর সেই চেষ্টায় কেউ বাধাও দেয়নি।’

যেভাবে রায়ের পর্যায়ে : তীব্র গণআন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। গণআন্দোলন দমাতে ১ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা ও ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গুলি ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। ওই বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকা- ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এর প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করা হয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আদেশের মাধ্যমে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ১২ মে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ১৩টি ভলিউমে সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দমনে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা, নির্দেশ প্রদান, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ জনকে হত্যা, সাভারের আশুলিয়ায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় ৫ অভিযোগ আনা হয়েছে।

১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। এরপর ১৬ জুন এক আদেশে দুজনকে আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। তবে, দুজনের কেউই এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে হাজির কিংবা আত্মসমর্পণ করেননি। গত ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ, প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় গত ৮ অক্টোবর। আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ২৩ অক্টোবর সমাপনী বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদ-ের আরজি জানান। এ ছাড়া শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন আসামিদের খালাসের আরজি জানান।