রক্তক্ষরণেই বিচারকপুত্রের মৃত্যু, মামলা

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনের মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত রক্তক্ষণ। মরদেহের ময়নাতদন্তের পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এ তথ্য জানিয়েছেন। হত্যাকা-ের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার দুপুরে আব্দুর রহমান হত্যা মামলা করেছেন। এরপরই সন্তানের মরদেহ নিয়ে রওনা হন গ্রামের বাড়ি জামালপুর।

নিহত সুমনের মরদেহ গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রাখা ছিল। গতকাল সকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। মর্গে তার মরদেহ ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন এবং প্রভাষক শারমিন সোবহান কাবেরী। এ সময় মর্গের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন নিহত সুমনের বাবা বিচারক আব্দুর রহমান।

ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডা. কফিল উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ধারালো ও চোখা অস্ত্রের আঘাতে শরীরের তিনটি স্থানে রক্তনালি কেটে যাওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঘটে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছিল। এতেই তার মৃত্যু হয়। তিনি আরও জানান, সুমনের ডান ঊরু, ডান পা ও বাম বাহুতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে। এসব স্থানে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি কেটে যাওয়ায় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটে। এই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর প্রধান কারণ।

সুমনের গলায় কালো দাগ পড়ার কারণ সম্পর্কে ময়নাতদন্তকারী এ চিকিৎসক বলেন, নরম কিছু দিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা থেকে এমন দাগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি মৃত্যুর মূল কারণ নয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং শ্বাসরোধের চেষ্টা একই সময়ে হয়েছে। আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর আসল কারণ বলে জানান ডা. কফিল।

ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। গতকাল দুপুরে তারা মরদেহ নিয়ে সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার চকপাড়া গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।

মামলা দায়ের : সুমন হত্যাকান্ড নিয়ে গতকাল মামলা করেছেন নিহতের বাবা বিচারক আব্দুর রহমান। এজাহার দিতে দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, একমাত্র পুত্রসন্তানের মৃত্যু, স্ত্রীর চিকিৎসা ও ঘটনার আকস্মিকতায় আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। এ অবস্থায় পরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে কিছুটা দেরিতে আমার আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুব উল আলমের মাধ্যমে মামলা রুজুর নিমিত্তে এজাহার প্রেরণ করি।

হত্যাকা-ের রহস্য কী : এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলেই এ হত্যাকান্ডের পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। একমাত্র হামলাকারী আটক হওয়ায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু তথ্য উদঘাটন করতে পেরেছে। এ হামলার একমাত্র অভিযুক্ত লিমন এটা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে, হামলাকারী লিমন নিহতের পরিবারের পূর্বপরিচিত। ৬ নভেম্বর সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে কিছু তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ। এখন মূলত তার এ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা এবং হত্যার কারণ নিশ্চিত হতে চায় পুলিশ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লিমন চিৎকার করে বেশ কিছু কথা বলেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে কাজ করার সুবাদে প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকেই বিচারক আব্দুর রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে তার পরিচয়। চিৎকার করে তিনি বেশ কিছু আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তাও বলেন। তবে লিমনের এসব কথা আমলে না নেওয়ার এবং গণমাধ্যমে প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন রাজশাহী মহানগর পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে এ আহ্বান জানান।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার গাজীউর রহমান জানান, আসামি লিমন মিয়াকে হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা চলছে। তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হবে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যাবে। তিনি বলেন, এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন দিক নিয়েই কাজ করছে পুলিশ। সিলেটে গত ৬ নভেম্বর যে জিডি হয়েছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। গত ৬ নভেম্বর নিহতের মা তাসমিন নাহার লুসী জালালাবাদ থানায় যে জিডি করেছিলেন, তাতে তিনি লিমনের হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা করেন। এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। লিমন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে পুলিশ তার কাছ থেকে হত্যা রহস্য উদঘাটনে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা গাজীউর রহমান।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানাধীন ডাবতলা এলাকায় রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুর রহমানের বাসায় ঢুকে তার ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী গুরুতর আহত হন। আহত হন হামলাকারী লিমন মিয়া নিজেও।

এদিকে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, আহত তাসমিন নাহার লুসী ও লিমন মিয়ার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল রয়েছে।