আগামীকাল সোমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হবে। এই রায়কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দুই দিনের শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দলটি লকডাউন ডেকে নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছিল। নতুন কর্মসূচিকে ঘিরে আবারও যানবাহনে আগুন, পেট্রোল বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ত্রিশটি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং সহস্রাধিক স্থানে বোমাবাজি করা হয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, এসব ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে ঢাকাসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। নিরাপত্তায় কোনো ফাঁকফোকর রাখা হবে না। ইতিমধ্যে পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, তিন দিন আগে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট পুলিশ সদর দপ্তরে গোপন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সারা দেশে ৭১২ জন অগ্নিসংযোগকারীর তালিকাসহ তাদের নিয়ন্ত্রণকারীদের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে ভাসমান অপরাধী ও বস্তিবাসীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। হুন্ডির মাধ্যমে কলকাতা থেকে অর্থ আসছে এবং তা পাঠাচ্ছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম। তারা বাংলাদেশে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, সেই তথ্যও পুলিশের হাতে এসেছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, আওয়ামী লীগ ভাড়াটে টোকাইদের দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। দলটি এখন ভাড়াটে ক্ষুদ্র দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অগ্নিসংযোগকারীদের নামের তালিকা পুলিশের হাতে : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটেছে। এতে জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গণপরিবহন ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সমাজের দুর্বল অংশবিশেষ করে টোকাই, পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৭১২ অগ্নিসংযোগকারীর নাম-পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে জোরালো অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ পুলিশের হাতে রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে ও গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, মূল পরিকল্পনাকারীরা সরাসরি মাঠে না নেমে স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করেছেন। এজেন্টরা মাদকাসক্ত, বেকার যুবক ও পথশিশুদের টার্গেট করছে। প্রতিটি অগ্নিসংযোগের জন্য টাকা, মাদক কিংবা খাবারের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কারণে পথশিশুরা সহজেই এই ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
তালিকায় উল্লেখযোগ্য যারা : পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরে মাহবুব, সাগর শেখ, মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী এলাকায় সখিনা, বিউটি, সুরাইয়া ওরফে লিপি, সোহেল, জেনেভা ক্যাম্পের আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, রিজিয়া, আসাদ, মোকছেদ, শাকিল, বছিলার নাছরিন, লতা বেগম, সুফিয়া, নসু মিয়া, শেখেরটেকের স্বপন মিয়া, জসিম ওরফে কানা জসিম, আগারগাঁও বিএনপি বস্তির আফরোজা আক্তার হাসি, ফাতেমা, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের জুলহাস, ঢাকার সুজন, শাহরিয়ার হোসেন প্রিন্স, রফিকুল ইসলাম, মতিয়ার রহমান খলিল, শামসুল হুদা, মিঠুন আকন, পারুল, অখিল, মতিয়ার রহমান খলিল, পুরান ঢাকার অলিউর রহমান, নোয়াখালীর আবদুল বাতেন, ঢাকার সুরুজ মিয়া, তারেকুজ্জামান, মানিক মিয়া, টিটু সুলতান, ইদ্রিস আলী, শাহজাহান মিয়া, কবির আহমেদ, মনির হোসেন, রাসেল আকন, রুহুল আমিন, জমির হোসেন, নিজাম ও লাকি আকন, কক্সবাজারের জয়নাল আবেদীন, সুলতান আহমেদ, ফজল কাদের, কুমিল্লার রুহুল আমিন, আবদুর রহিম, বনানীর ফিরোজ আলম, সায়দাবাদের মোহাম্মদ ওয়ায়েদুজ্জামান, আবদুল আউয়াল, মুন্সীগঞ্জের ফারুক আহম্মেদ, দিনাজপুরের সোহেল রানা, নরসিংদীর মনির আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের ওয়ায়েদউল্লাহ, মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সীগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল, বিমানবন্দরে নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, এনামুল, রমিজ উদ্দিন, মোতালেব খান, বাহার, লিটন দাস, উত্তরায়, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, গুলিস্তানে মোহাম্মদ আলী, রাজিব শুভ্র, মহাখালীর জামিল আহমেদ, মো. সেলিম, হোসেন, লাবু, কামরুল হাসান, কুমিল্লার মোহাম্মদ মহসিন, শাহজালাল মিয়া, চট্টগ্রামের কাশিম আহমেদ, মুরাদ উদ্দিন, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ করিম, আবদুল জলিল, আলী হোসাইন, পাভেল মিয়া, মঞ্জুরুল হক, কাশিম মিয়া, ময়নসিংহের আবুল হাসান প্রমুখ।
হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসছে : পুলিশ সদর দপ্তরের একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) জানান, টোকাইদের ব্যবহারের অন্যতম কারণ হলো হোতাদের জন্য এটা ঝুঁকিমুক্ত। ধরা পড়লেও তারা সহজে জামিন পেয়ে যায় বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় কঠোর শাস্তি হয় না। বিদেশ থেকে, বিশেষ করে কলকাতা থেকে হুন্ডির মাধ্যমে নাশকতাকারীদের কাছে অর্থ আসছে। নানক ও মির্জা আজম এই অর্থ পাঠাচ্ছেন। তারা দেশের অভ্যন্তরে কাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন, সেই তথ্যও পুলিশের কাছে রয়েছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় আমরা পেয়েছি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো ফাঁক রাখা হবে না। পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
যেসব এলাকায় ভাসমান ও টোকাই বেশি : পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছেঢাকার কড়াইল, জুরাইন বালুর মাঠ, গোপীবাগ টিটিপাড়া, মালিবাগ কুমিল্লা বস্তি, মোহাম্মদপুর বালুর মাঠ, মালিবাগ রেললাইন, খিলগাঁও নোয়াখাইল্লা, মীর হাজিরবাগ, ধলপুর সিটিপল্লী, শ্যামপুর, গেন্ডারিয়া রেললাইন, পারগে-ারিয়া, মহাখালী সাততলা, পোস্তগোলা ডিআইটি, ডেমরা চরপাড়া, পূর্ব দোলাইরপাড়সহ অধিকাংশ বস্তিতে ভাসমান অপরাধীদের আস্তানা রয়েছে। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, সাভার, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায়ও ভাসমান অপরাধী ও টোকাইদের উপস্থিতি রয়েছে। এসব স্থান থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের সংগ্রহ করে অগ্নিসন্ত্রাস চালাচ্ছে।
বড় পার্টির অফার দিয়ে বাসে আগুন : রাজধানীর শাহ আলী এলাকায় বাসে আগুন দেওয়ার পর এক তরুণকে আটক করা হয়। সে পুলিশকে জানায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার মাধ্যমে ‘বড় পার্টি’ করার অফার দেওয়া হয়েছিল। রাজি হলে ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি বাসে আগুন দিতে বলা হয়। ওই ঘটনায় পালাতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই কিশোর মারা যায়। পুলিশ জানায়, সাধারণত রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমজীবী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও ভাড়াটে অপরাধীদের নাশকতায় উৎসাহিত করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।
আওয়ামী লীগ এখন ভাড়াটে টোকাইদের ওপর নির্ভরশীল : প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, আওয়ামী লীগ এখন ভাড়াটে টোকাই-ধরনের ক্ষুদ্র দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, দলটির তৃণমূল ভেঙে গেছে বা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর দখলে চলে গেছে। ফলে তারা শুধু ফাঁকা বাসে আগুন, ৩০ সেকেন্ডের ঝটিকা মিছিল কিংবা এআই-চালিত প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী এখন অনেক বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ায় আগামী দিনগুলোয় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।