হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে লাশের ২৬ খন্ড

হত্যার কারণ হিসেবে গ্রেপ্তারদের ভিন্ন তথ্য

হত্যার পর ২৬ টুকরো করে দুটি ড্রামে ভরে রাজধানীর হাইকোর্ট মোড় এলাকায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের (৪২) মরদেহ ফেলে রাখার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন দুজন। গত শুক্রবার র‌্যাবের অভিযানে কুমিল্লার বিজরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন শামীমা আক্তার কোহিনুর। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ জরেজুল ইসলামকে। গ্রেপ্তার দুজন র‌্যাব ও ডিবির কাছে হত্যার নেপথ্যের কারণ হিসেবে একেবারেই ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব ও ডিবি হত্যার কারণ জানাতে পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলনও করে গতকাল শনিবার। সেখানেই উঠে এসেছে সাংঘর্ষিক তথ্য।

র‌্যাব বলছে, আশরাফুলকে ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে তাকে হত্যা করা হয়। আর ডিবি পুলিশ বলছে, ত্রিভুজ প্রেমের কারণে এই হত্যাকা- ঘটেছে।

রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এ-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আশরাফুল ও জরেজ পুরনো বন্ধু। সম্পর্কের খাতিরে আশরাফুল তার বন্ধুকে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে জাপান পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে কথিত প্রেমিকা শামীমার ৭ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। মূলত এই টাকার সংস্থান এবং শামীমার সঙ্গে একান্তে দেখা করার আশায় দুই বন্ধু গত সোমবার রাতের গাড়িতে রংপুর থেকে ঢাকায় রওনা দেন। পরদিন ঢাকায় পৌঁছানোর পর তিনজন একসঙ্গে থাকার জন্য একটি নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনজনের পরিকল্পনায় ডেমরার ব্যাংক কলোনি এলাকায় একটি বাসাভাড়া নেওয়া হয়। তিনজন মিলে সেই বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। স্থানীয় বাজার থেকে তারা একটি তোশক, তিনটি বালিশ ও জানালার পর্দা কেনেন। এরপর পরস্পর সম্মতিতে তারা একে অন্যের সঙ্গে শারীরিক মেলামেশা করেন। একপর্যায়ে আশরাফুল শামীমার সঙ্গে অস্বাভাবিক (পায়ুপথে) যৌনকর্ম করতে চাইলে শামীমা তাতে রাজি হননি। তখন দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয় এবং শামীমা কান্নাকাটি শুরু করেন। এমন সময় জরেজুল বিষয়টি নিয়ে বন্ধুর ওপর হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এরপরও আশরাফুল শামীমাকে জোরাজুরি করতে থাকেন। একপর্যায়ে জরেজুল প্রথমে আশরাফুলকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। এতে তিনি চিৎকার শুরু করলে শামীমা তার ওড়না এবং সঙ্গে থাকা স্কচটেপ দিয়ে আশরাফুলের মুখ বেঁধে ফেলেন। মুখ বাঁধা থাকায় এবং জরেজের আঘাতে একপর্যায়ে আশরাফুল মারা যান।

এর আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। সেখানে তিনি আসামি শামীমার বরাত দিয়ে হত্যাকা-ের বর্ণনা দেন। তার বরাতে র‌্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জরেজুলের সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় ধরে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আশরাফুলকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছিলেন জরেজুল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ নভেম্বর জরেজুল ও আশরাফুল রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। ১২ নভেম্বর তারা শনিরআখড়া এলাকায় একটি বাসাভাড়া নেন। এ সময় শামীমাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশরাফুলকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান শামীমা। পরে আশরাফুল ও শামীমার অনৈতিক কাজের ভিডিও ধারণ করা হয়। এই ভিডিও দেখিয়েই টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়। ধারণ করা ভিডিওটি শামীমার মোবাইল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব আরও জানায়, ১২ নভেম্বর দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়লে জরেজুল তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেন এবং মুখে স্কচটেপ লাগান। এরপর হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। অতিরিক্ত আঘাত এবং মুখে স্কচটেপ লাগানো থাকায় শ্বাস নিতে না পেরে আশরাফুল মারা যান। ১৩ নভেম্বর সকালে মরদেহ গুম করতে পাশের বাজার থেকে দুটি প্লাস্টিকের ড্রাম ও অন্যান্য সরঞ্জাম আনা হয়। পরে জরেজুল চাপাতি দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে দুটি ড্রামে ভরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাইকোর্ট এলাকায় রেখে যান। আশরাফুলের রক্তমাখা সাদা রঙের পাঞ্জাবি-পায়জামা, হত্যায় ব্যবহৃত দড়ি ও স্কচটেপ উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন আরও বলেন, ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে আশরাফুলকে মাল্টার শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। তিনি অচেতন হওয়ার পর জরেজ বাইরে থেকে শামীমা ও আশরাফুলের অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করেন। ১২ নভেম্বর দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়লে জরেজ তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেন এবং মুখে স্কচটেপ লাগান। এরপর ইয়াবা সেবনের উত্তেজনায় জরেজ হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। লাশ পাশের ঘরে রেখেই দুজন রাত কাটান এবং শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন।

দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব ও ডিবি জানিয়েছে, জরেজুল একজন মালয়েশিয়াপ্রবাসী। মালয়েশিয়া থাকার সময় একটি অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্মে তার সঙ্গে শামীমার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। গত প্রায় দেড় মাস আগে জরেজ দেশে আসেন। দেশে আসার পরও শামীমা ও জরেজুলের মধ্যে বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে কথাবার্তা হতো। জরেজুলের স্ত্রী এটি জেনে যান। তখন তার স্ত্রী জরেজুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আশরাফুল ইসলামের সহায়তা চান এবং আশরাফুলকে শামীমার নম্বর দেন। আশরাফুল শামীমার প্রেমে পড়ে যান। ভিডিও কলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ হতো।

এ ঘটনায় গত শুক্রবার আশরাফুলের পরিবার জরেজুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করে। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে গতকালই। র‌্যাব ও ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ঘটনায় অধিকতর হলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।