দ্বিতীয় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছে নির্বাচন কমিশন। সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলের নেতারা জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আস্থা সংকটের বিষয়গুলো জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তারা বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বিভাজনের চাপে রয়েছে আর এ পরিস্থিতি কাটাতে হলে ইসিকে আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে।
সংলাপে বক্তারা গণভোটের পদ্ধতিগত দুর্বলতার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন। এ ছাড়া, ধর্মীয় স্থানে রাজনৈতিক প্রচারণা নিষিদ্ধকরণ এবং নির্বাচনী আচরণবিধির কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগের দাবি জানান।
গতকাল রবিবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংলাপে রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী সংলাপে ১২টি দল অংশ নেয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণফোরাম, গণফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে মতবিনিময় করে ইসি।
এ ছাড়া দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), তৃণমূল বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংলাপে অংশ নেয়।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, বর্তমান সরকার দেশটাকে একেবারে বিভক্ত করে ফেলেছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৪০-৫০টি, অথচ আলোচনা হয় মাত্র দুই-তিনটি দলের সঙ্গে।
গণভোটের সমালোচনায় তিনি বলেন, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হচ্ছে। মানুষ জানেই না গণভোটের বিষয়গুলো কী। চারটি প্রশ্ন দেওয়া হলেও, আলাদা মত বা অমত জানানোর সুযোগ নিয়ে সংশয় আছে। গণভোটে ৫ শতাংশ ভোট নাও পড়তে পারে। বিএনপি ভোট না দিলে তাদের ৩০ শতাংশ ভোটার যাবে না, আওয়ামী লীগ ভোট না দিলে তাদের ৪৩-৪৪ শতাংশ ভোটারও যাবে না। জাতীয় পার্টিকেও ব্যান করার কথা উঠছে, যা গণতন্ত্রবিরোধী।
তিনি নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে বলেন, গণভোট যেন নিন্দার কারণ না হয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কমিশন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে ভোট করতে না দেওয়া হলে গণভোট থেকে বিমুখ হবে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোটার। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি, বাম দল, ইসলামপন্থি দল কাউকেই বাইরে রেখে নির্বাচন করা যাবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, অতীতে যারা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের কাছ থেকে আমরা সেই প্রত্যাশিত নিরপেক্ষতা পাইনি। তারা দক্ষ ছিলেন কিন্তু নিরপেক্ষতা ছিল না। সবসময় মনে হয়েছে, তারা কোনো অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের আশা ছিল নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যেই হবে, কিন্তু নানা কারণে তা হয়নি। এখন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে এবং সঙ্গে গণভোটও। গণভোট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে চারটি সাংবিধানিক সংস্কারকে একটি প্যাকেজ আকারে ভোটে তোলা হচ্ছে। এভাবে প্যাকেজ আকারে হ্যাঁ/না ভোট হলে এটি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যাবে। চারটির মধ্যে আমি দুটিতে হ্যাঁ দিতে চাই, দুটিতে না দিতে চাই সেই সুযোগ আপনি দিচ্ছেন না। আমাকে হয় চারটিতেই হ্যাঁ দিতে হবে, নয় চারটিতেই না দিতে হবে। এটি একটি গুরুতর সমস্যা।
তিনি নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে বলেন, গণভোট যেন হাস্যকর অবস্থায় পরিণত না হয়। এ ক্ষেত্রে কমিশনকে দৃঢ় থাকতে হবে।
গণফ্রন্টের মহাসচিব অ্যাডভোকেট আহমেদ আলী শেখ বলেন, আমরা চাই, এ নির্বাচনটি যেন ইতিহাসে স্থান পায়। এর জন্য কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি সুস্পষ্ট নীতিনির্দেশনা জরুরি। সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া কমিশনের বাস্তব সীমাবদ্ধতা কাটানো সম্ভব নয় এবং এ বাস্তবতা অস্বীকার করাও যাবে না।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মহাসচিব জাফর আহমেদ জয়, আপনারা যে বিধিমালা জারি করেছেন, তা শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি না আমি নিশ্চিত নই। আমরা চাই, আপনারা কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না। আপনারা শপথ নিয়েছেন, দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সম্মানের পথ রয়েছে, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী বলেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রাজনৈতিক পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনকে ক্রমেই সংঘাতময় করে তুলছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক অবাঞ্ছিত জেদাজেদি এবং ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র বাসনা ক্রমাগত নির্বাচনের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।
ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি শামসুল আলম বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আপনারা যে আচরণবিধি করেছেন, এগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হলে একটা সুন্দর নির্বাচন আপনারা উপহার দিতে পারবেন। আমরা আশা করি আইনগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি বিএসপি কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক বলেন, মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা ধর্মীয় সমাবেশে নির্বাচনী প্রচারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে শুধু আচরণবিধি নয়, সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইন প্রণয়ন করতে হবে। দেশ, সার্বভৌমত্ব ও সব ধর্মের মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার জায়গা থেকে আমরা চাই ধর্মীয় স্থানে রাজনৈতিক প্রচারণা পুরোপুরি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, নির্বাচন কমিশনের পরিষ্কারভাবে বলা উচিত মসজিদে আমি রাজনীতি করব কি করব না। এ ক্ষেত্রে কোনো দয়ামায়া থাকলে হবে না। কেউ সালাম নেওয়ার জন্য যায়, কেউ দোয়া নেওয়ার জন্য যায়। সেটার লিমিট থাকা উচিত। নির্বাচন কমিশনের উচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কী কী সেটা স্পষ্ট করা। না হলে সংকট বাড়বে।
ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী বলেন, আমরা চাই বর্তমান নির্বাচন কমিশন সাদাকে সাদা বলবে, কালো কে কালো বলবে। আপনারা যেটা বলবেন সেটা বাস্তবায়ন দেখতে চাই। নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্বশীল ও দলনিরপেক্ষ থাকতে হবে, ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তফসিলের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য কার্যকর অভিযান চালাতে হবে।
ইসির কঠোর বার্তা : নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, এবারের নির্বাচনে কমিশনের পক্ষ থেকে বার্তা হচ্ছে, যারা আচরণবিধি মানবে না। অপপ্রচার চালাবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কতটুকু হবে আমরা জানি না, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া যেসব কর্মকর্তা সামান্যতম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করার চেষ্টা করবে সে বা তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে যে আইনগুলো ছিল, সেগুলোতে আমরা শুধু পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য সংশোধন, পরিমার্জন করিনি। আমরা এগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য করেছি।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) তাহমিদা আহমদ বলেন, আপনারা বলেছেন অংশগ্রহণমূলক। অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ছয় কোটি পুরুষ, ছয় কোটি মহিলা। শুধু পুরুষ আসলেন, মহিলারা আসলেন না, তাহলে কি অংশগ্রহণমূলক হবে? অবশ্যই না। কাজেই আমাদের পিছিয়ে পড়া মহিলা অংশটা আনার দায়িত্ব বাবা হিসেবে, ভাই হিসেবে, স্বামী হিসেবে আপনাদেরই নিতে হবে।
ইসি মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য করণীয় সবকিছুই করছে নির্বাচন কমিশন। একটি ভালো নির্বাচন করা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, নির্বাচনে আমাদের প্রায় ৯ লাখের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে থাকবে। থাকবে ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মোবাইল কোর্ট, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, মনিটরিং টিম, অবজারভেশন টিমও মাঠে থাকবে। এগুলো সব নিয়ে আমরা মাঠে নামার পরিকল্পনা করেছি।
ইসি আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন আগে যে ভুলগুলো করেছে, এই ভুলের স্তূপের পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে, আপনাদের সহযোগিতায় এ ভুলগুলোকে এক পাশে রেখে একটা ভালো নির্বাচন করব, এজন্য সবার সহযোগিতা চাই। সবার সহযোগিতায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে।
আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান সিইসির : সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, আচরণবিধি মানলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।
সিইসি বলেন, নির্বাচনের আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) আমরা ড্রাফট করার পর দীর্ঘদিন ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রেখেছিলাম। এ সময় অনেকেই মন্তব্য দিয়েছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও লিখিত আকারে মতামত প্রদান করেছে। আমরা প্রায় সব মতামতই গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনেকটাই আচরণবিধি মানার ওপর নির্ভর করে। প্রার্থীরা যদি এ আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তবে নির্বাচনের পরিবেশ স্বাভাবিক, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য থাকবে। তাই এ বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা অনুগ্রহ করে আচরণবিধিটি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন, আপনাদের দলের সহকর্মীদের ব্রিফ করবেন। দলীয় পর্যায়ে আচরণবিধি প্রচার করলে এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।