বেহেশতের চাবি যে নামাজ

প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের জন্য দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। রাসুল (সা.) যখন মিরাজে গমন করেন, তখন আল্লাহতায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। নামাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম দোয়া বা প্রার্থনা। এ প্রার্থনার বিধান দান করে আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। নামাজ বিশ্বাসীদের আধ্যাত্মিক উন্নতির পাথেয় ও মেরাজস্বরূপ। নামাজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নামাজ বেহেশতের চাবি’। (তিরমিজি) যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ খুশু-খুজু তথা বিনয়, নম্রতা, একনিষ্ঠতা ও আন্তরিতার সঙ্গে আদায় করা হবে তখন নামাজ বেহেশতের জন্য চাবি হবে অর্থাৎ এমন নামাজ দিয়ে পরকালে জান্নাত লাভ করা যাবে।

খুশু-খুজু নামাজের প্রাণ। নামাজের যাবতীয় ফজিলত, প্রভাব ও উপকারিতা এই খুশু-খুজুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করলে নামাজ সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়। আর খুশু-খুজুবিহীন নামাজ প্রাণহীন-আত্মাহীন লাশের মতো। তাই নামাজে খুশু-খুজু অবলম্বন করা মুমিন বান্দার জন্য আবশ্যক।

নামাজে খুশু-খুজুর গুরুত্ব অনেক। ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের জন্য খুশু-খুজুর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানের যান্ত্রিক ও প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ একাগ্রতাবিহীন নামাজ দায়সারা ও শারীরিক ব্যায়ামের উপকারিতা ছাড়া তেমন কিছুই বয়ে আনে না। মহান আল্লাহর কাছে এমন নামাজের মূল্য নেই। এসব নামাজিদের মহান আল্লাহ নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন।’ (সুরা মাউন ৪-৫)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তারা নামাজের ব্যাপারে উদাসীন। অর্থাৎ প্রথম ওয়াক্তে নামাজ না পড়ে অধিকাংশ সময় শেষ ওয়াক্তে নামাজ পড়ে। অথবা উদ্দেশ্য হলো, নামাজের রুকন, শর্ত, ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতগুলো আদায়ের ব্যাপারে অলসতা করে এবং যেভাবে আদেশ করা হয়েছে সেভাবে আদায় করে না। আরেকটি ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে, তারা নামাজের মধ্যে মনোযোগ ঠিক রাখে না, মহান আল্লাহর কাছে সমর্পিত হয় না এবং নামাজের মুহূর্ত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না। মোটকথা ‘উদাসীন’ শব্দটি প্রতিটি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। উপরোল্লিখিত যে কাজটি কেউ করবে সে এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। আর যার মধ্যে সবগুলোই পাওয়া যাবে, সে এই আয়াতের পরিপূর্ণ প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রেই কপটতা পূর্ণাঙ্গরূপে তার মাঝে প্রকাশ পাবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ৮/৪৯৩)

খুশু-খুজু অর্জনের জন্য নামাজের রুকনগুলো (রুকু, সেজদা, কিয়াম) শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে। নামাজে রাসুল (সা.) অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে রুকনগুলো আদায় করতেন, যাতে প্রত্যেকটি অঙ্গ তার যথাযথ স্থানে অবস্থান করে। (সিফাতুস সালাহ ১৩৪) তিনি বলেন, ‘এই নিয়মে নামাজ আদায় না করলে তোমাদের কারও নামাজ সঠিক হবে না।’ (আবু দাউদ ৮৫৮)

তড়িঘড়ি ও ঠোকর মারার মতো করে নামাজ আদায় করে কখনো খুশু-খুজু হাসিল করা যায় না। ধীরতা-স্থিরতা ছাড়া কখনো খুশু-খুজু অর্জনই সম্ভব হয় না। নামাজে মুসল্লির যত বেশি ধীরস্থিরতা বজায় থাকবে, তার খুশু-খুজু তত বেশি বাড়বে। খুশু-খুজুর পরিমাণ যত কম হবে, তাড়াহুড়োর পরিমাণ তত বেশি হবে।

একজন সফল মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে খুশু-খুজু সহকারে নামাজ আদায় করবে। যারা খুশু-খুজু সহকারে নামাজ আদায় করে, আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে একাগ্রতা ও নম্রতা (খুশু-খুজু) অবলম্বন করে।’ (সুরা মুমিনুন ১-২) আল্লাহতায়ালা আমাদের পরিপূর্ণ খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক