সম্পদ বিলিয়ে পরকালের সঞ্চয়

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

মানুষের জীবনে সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। জীবনের প্রয়োজন পূরণ, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস এবং মানবকল্যাণে অবদান রাখার জন্য সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ইসলাম সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে একটি পরীক্ষা ও আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। মানুষ কীভাবে সম্পদ অর্জন করছে, কোথায় ব্যয় করছে এবং কতটা উদারতার পরিচয় দিচ্ছে, সেটার ওপরই নির্ভর করে তার প্রকৃত সফলতা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণ অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলো থেকে ব্যয় করবে।’ (সুরা আলে ইমরান ৯২)

এই আয়াত মানুষের অন্তরে দানশীলতার যে চেতনা জাগ্রত করে, তা শুধু অর্থ ব্যয়ের শিক্ষা নয়, বরং হৃদয়ের কৃপণতা দূর করারও শিক্ষা। সাধারণত মানুষ নিজের প্রিয় জিনিস আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। সম্পদ, জমি, বাড়ি, সঞ্চয় কিংবা প্রিয় কোনো বস্তু নিজের কাছেই রাখতে ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই প্রিয় সম্পদ থেকে ব্যয় করাই প্রকৃত কল্যাণের পথ।

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ সঞ্চয় করা নিষিদ্ধ নয়। বরং বৈধ উপায়ে উপার্জন এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষণ করা প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন সম্পদ মানুষের হৃদয়কে কঠোর করে দেয়, দরিদ্রের অধিকার ভুলিয়ে দেয় এবং আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে, তখন সেটি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোরআনে সম্পদ জমিয়ে রাখা এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় না করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা স্বর্ণ ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুরা তওবা ৩৪) ইসলাম এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে সম্পদ কেবল ধনীদের হাতেই আবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরে প্রবাহিত হবে। এ জন্য জাকাত, সদকা, ওয়াকফ, ফেতরা এবং বিভিন্ন ধরনের দানের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং বৈষম্য কমে আসে।

দানশীলতা মহৎ চরিত্র। একজন দানশীল ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করার পাশাপাশি অন্যের কষ্টও অনুভব করেন। ক্ষুধার্তকে খাদ্য, অসহায়কে সহায়তা, রোগীকে চিকিৎসা এবং শিক্ষা বঞ্চিতকে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মানবতার সেবা করেন। এই সেবার প্রতিদান শুধু পৃথিবীতেই নয়, আখেরাতেও সংরক্ষিত থাকে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তোমার সম্পদের মধ্যে তোমার হলো শুধু তাই, যা তুমি খেয়ে শেষ করেছ, পরিধান করে পুরনো করেছ অথবা দান করে পরকালের জন্য সঞ্চয় করেছ।’ (সহিহ মুসলিম ২৯৫৮)

এই হাদিস মানুষের সম্পদ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়। আমরা সাধারণত মনে করি, ব্যাংক হিসাব, জমি কিংবা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সম্পদই আমাদের প্রকৃত সম্পদ। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, যে সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা হয়েছে, সেটিই আসলে স্থায়ী সম্পদ। পৃথিবীতে রেখে যাওয়া সবকিছু একদিন অন্যের হাতে চলে যাবে। কিন্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদ চিরস্থায়ী পুরস্কার হিসেবে পরকালে ফিরে আসবে।

ইসলামের ইতিহাসে দানশীলতার অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদও উৎসর্গ করেছেন। হজরত আবু বকর (রা.) একাধিকবার নিজের প্রায় সব সম্পদ মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন। হজরত ওসমান (রা.) মুসলমানদের কল্যাণে বিপুল অর্থ দান করেছেন। হজরত আবু তালহা (রা.) তার সবচেয়ে প্রিয় বাগান আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছিলেন।

দান মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে। সম্পদের প্রতি অতি আসক্তি মানুষের অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেয়। সে শুধু নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাব করে। কিন্তু যখন মানুষ দান করে, তখন তার হৃদয়ে উদারতা সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে শেখে যে, সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং মানুষ কেবল তার দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণকারী। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার, লোভ ও কৃপণতা থেকে মুক্ত করে।

মহান আল্লাহ কোরআনে দানকারীদের জন্য বহুগুণ প্রতিদানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয়, প্রতিটি শীষে থাকে একশ দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন।’ (সুরা বাকারা ২৬১)

এই আয়াত স্পষ্ট করে, দান কোনো ক্ষতি নয়, বরং লাভের সবচেয়ে নিশ্চিত বিনিয়োগ। ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, কিন্তু আল্লাহর পথে ব্যয় কখনো বিফল হয় না। হয়তো মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ফল দেখতে পায় না, কিন্তু আল্লাহ তার প্রতিদান সংরক্ষণ করেন।

বর্তমান পৃথিবীতে সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মানুষ আরও ধনী হওয়ার জন্য নিরন্তর ছুটছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার মাঝেও অসংখ্য দরিদ্র, অসহায়, এতিম, বিধবা ও বঞ্চিত মানুষ আমাদের আশপাশে বসবাস করছে। তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন না করে শুধু সম্পদ বাড়ানোর চিন্তা একজন মুমিনের জন্য কাম্য হতে পারে না।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত