ধৈর্যশীল দরিদ্রদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

মানুষ সাধারণত সম্পদকে সৌভাগ্য আর দারিদ্র্যকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। মহান আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় ইমান, তাকওয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে। ধন-সম্পদ কিংবা দারিদ্র্য কোনো অবস্থাই শেষ পরিণতি নয়, বরং উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান পরীক্ষা। ধনীদের জন্য এই পরীক্ষা কৃতজ্ঞতা ও দানশীলতার আর দরিদ্রদের জন্য ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের। দরিদ্ররা যদি তাদের অবস্থার ওপর ধৈর্যধারণ করে যথাযথভাবে মহান আল্লাহর ইবাদত করে তাহলে তিনি তাদের ধনীদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদের পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদের যা প্রদান করেছেন, তাতে পরীক্ষা করতে পারেন।’ (সুরা আনআম ১৬৫)

এই আয়াত মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করে দেয়, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সেটি আল্লাহর নির্ধারিত দায়িত্ব ও পরীক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও এই দারিদ্র্যের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি কখনো ভোগবিলাসকে জীবনের আদর্শ বানাননি, বরং সাধারণ জীবনযাপনেই খুঁজে নিয়েছিলেন আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ও আল্লাহপ্রদত্ত সম্মান। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, দরিদ্র সাহাবিরাই ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গী। তারা পরিশ্রমী, ত্যাগী ও আল্লাহভীরু ছিলেন। তাদের জন্যই নবী করিম (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন, তারা ধনীদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কারণ, ধনীরা সম্পদের হিসাব দিতে ব্যস্ত থাকবে আর দরিদ্ররা সেই হিসাবের ঝামেলা ছাড়াই প্রবেশ করবে জান্নাতে। আল্লাহ যাদের সম্পদ দান করেছেন, তাদের দিয়েছেন বিশেষ দায়িত্ব। আর যাদের দারিদ্র্যের জীবন দান করেছেন, তাদের জন্য পরকালে রেখেছেন অসংখ্য পুরস্কার। মহানবী (সা.) ধৈর্যশীল দরিদ্র ব্যক্তির জন্য একাধিক সুসংবাদ দান করেছেন।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, একদিন আমি একদল নিঃস্ব মুহাজিরের সঙ্গে বসলাম। তাদের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে, (পরিধেয় বস্ত্র খুবই ছোট হওয়ায়) পরস্পর পরস্পরের সতর আড়াল করে বসেছিলেন। একজন আমাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এসে দাঁড়ালে তার তেলাওয়াত বন্ধ করলেন। নবীজি (সা.) সালাম দেওয়ার পর প্রশ্ন করলেন, তোমরা কী করছিলে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! ইনি আমাদের কাছে কোরআন পড়েন আর আমরা মহান আল্লাহর কিতাব মনোযোগ দিয়ে শুনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমার উম্মতের মধ্যে এমন ধৈর্যশীল লোক রেখেছেন, যাদের সঙ্গে আমাকেও ধৈর্যধারণের আদেশ দিয়েছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে এসে বসলেন এবং আমাদের জামাতকে পূর্ণতা দিলেন। এরপর তিনি উপস্থিত লোকদের হাত দিয়ে ইশারা করে গোল হয়ে বসার আদেশ দিলেন। তারা গোলাকার হয়ে বসলেন এবং সবার চেহারা তার দিকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, আমার মনে হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) আমি ছাড়া তাদের মধ্যে আর কাউকে চিনতে পারেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে নিঃস্ব-দুর্বল মুহাজিররা! তোমাদের জন্য কিয়ামতের দিনের পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ। তোমরা ধনীদের চেয়ে অর্ধ দিবস আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর এই অর্ধ দিবসের পরিমাণ হলো পাঁচশ বছর।’ (সুনানে আবু দাউদ)

জীবনযাপনের বিচারে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে দরিদ্র মানুষের সাদৃশ্য বেশি। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর পরিবারবর্গ মদিনায় আসার পর থেকে এক নাগাড়ে তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খায়নি। আর এ অবস্থায় তার ওফাত হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি) তিনি আরও বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর পরিবার একদিনে দুই বেলা খাবার খেলে, তার এক বেলা শুধু খেজুর খেয়ে কাটাতেন।’ (সহিহ বুখারি)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত