জুলাই হত্যাকান্ডে হাসিনার মৃত্যুদন্ড

তখন বেলা পৌনে ৩টা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ পিনপতন নীরবতা। রায়ের শেষ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার যখন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণদন্ডের রায় ঘোষণা করেন, হাততালি এবং উল্লাসে ফেটে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মী, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের বাবা, মা এবং আন্দোলনে আহতরা। এর একটু পরেই আসে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদন্ডের রায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ দুজনই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়। রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালের প্ররোচনা, নির্দেশনায় এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ন্যায়বিচার এখানে পরাজিত হতে পারে না।’

মামলার অন্যতম আসামি ও রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) পুলিশের সাবেক মহাপরির্শক (আইজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছর কারাদন্ড দেয় আদালত। তার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। যদিও তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তবে ঘটনার দোষ স্বীকার করে পূর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশের শর্তে তিনি রাজসাক্ষী হয়েছিলেন। আমরা মনে করি তিনি সত্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়েছেন। তাই তাকে পাঁচ বছর কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হলো।’

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ দন্ডের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন, সরকার, শহীদ পরিবারের স্বজন ও আহতরা। তবে চৌধুরী মামুনের লঘু দন্ড নিয়ে জুলাই শহীদদের স্বজনদের অনেককে হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা যায়। অন্যদিকে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

গত বছর জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন একসময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। আন্দোলন দমনে ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। গুলি চালিয়ে ব্যাপক হত্যাকান্ড এবং নির্যাতনের দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। অন্তর্বর্তী সরকার বিচারের উদ্যোগ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করে। সংশোধন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল সোমবার এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তিন বিচারক পর্যায়ক্রমে পড়ে শোনান। অভিযোগ প্রমাণ ও সাজার অংশ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ বিচারক।

রায়ে দন্ডিত শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খানকে সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেয় আদালত। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম কোনো মামলায় রায় হলো গতকাল। একই সঙ্গে দেশের কোনো সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায়ে সর্বোচ্চ সাজা হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিরা ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। তবে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক থাকায় সে সুযোগ পাবেন না। আপিল করতে হলে তাদের বিচারিক আদালতে (ট্রাইব্যুনাল) আত্মসমর্পণ করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালত ও থানা মিলিয়ে তিনশর বেশি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া তার শাসনামলে গুমের ঘটনার দুটি মামলায় ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম কোনো মামলায় গত বছর ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।

শেখ হাসিনার মামলার রায় কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন দেশ জুড়ে নাশকতামূলক কার্যক্রম চলেছে। সংগত কারণেই নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দেশ জুড়ে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কয়েক দিন আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ‘লকডাউন’র ঘোষণা দেয়। এরপর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে গাড়ি পোড়ানো, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে নিয়মিত। রায়ের আগের দিন গত রবিবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় বাসে দেওয়া আগুনে পুড়ে এক চালকের মৃত্যু হয়। মানিকগঞ্জে একটি স্কুলবাসে আগুন দেওয়ার পর গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন এর চালক। সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশ জুড়ে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সুপ্রিম কোর্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে সেনা মোতায়েন চেয়ে সেনাসদরে চিঠি দেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। গতকাল ট্রাইব্যুনালের আশপাশ এলাকায় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এপিবিএনের সদস্যরা ছিলেন সতর্ক অবস্থানে। আশপাশের সড়কে যান চলাচল সীমিত করা হয়।

কে কী সাজা পেলেন : শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন দমনে ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশসহ ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-সংক্রান্ত পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।

প্রথম অভিযোগে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার্থী ও জনতাকে হত্যার প্ররোচনা, উসকানি, হত্যায় সম্পৃক্ততা এবং হত্যার মতো অপরাধ সংঘটনে প্রতিরোধে ব্যর্থতায় শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদন্ডাদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

দ্বিতীয় অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ড্রোন দিয়ে চিহ্নিত করে হেলিকপ্টার থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ, চতুর্থ অভিযোগে চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে তিন অভিযোগ মিলিয়ে তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হয়।

চতুর্থ অভিযোগে চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় আসাদুজ্জামান খানকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। রায়ে সাজার ঘোষণায় বলা হয়, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০ (৩) ধারা অনুযায়ী, প্রচলিত রেওয়াজ মাফিক সাজা কার্যকর করা হবে। দেশে রেওয়াজ অনুযায়ী, বেসামরিক আদালতের রায়ে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত হলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তা কার্যকর করা হয়।

রায় ঘিরে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে বাইরে যা হলো : সাবেক কোনো সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের রায় সংগত কারণেই গতকাল কাকডাকা ভোর থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। তবে সেনাবাহিনীর সদস্য, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ছিল তৎপর। সকাল ৮টার দিকে ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকের সামনে দেখা যায় অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মী। দেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কর্মীরাও এসেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। সকাল ৯টার দিকে সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। ৯টা ৬ মিনিটের দিকে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যান ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এ সময় শোনা যায় এ মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আনা হয়েছে। ৯টা ৭ মিনিটের দিকে তাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হয়। মুখে মাস্ক পরিহিত চৌধুরী মামুনকে নিয়ে যাওয়া হয় ট্রাইব্যুনালের ভেতরের হাজতখানায়।

গত রবিবার প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের প্রশাসনের বরাতে জানিয়েছিল, গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হবে বেলা ১১টায়। এরপর থেকে অপেক্ষা বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে বেশ কয়েকজন শহীদের বাবা, মা, ভাইসহ আন্দোলনে পা ও চোখ হারানো বেশ কয়েকজন জুলাই যোদ্ধা আসতে থাকেন ট্রাইব্যুনাল এলাকায়। ১১টা বাজার কিছুক্ষণ আগে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের স্বজন ও আহতরা ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে থাকেন। তবে ১১টা বাজার পরও সংবাদ সংগ্রহে আসা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ করতে না দেওয়ায় ট্রাইব্যুনালের গেটের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় সাংবাদিকদের। এর একটু পরই গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে তখন কানায় কানায় পূর্ণ। আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জুলাই আন্দোলনের শহীদের স্বজন, আহতরা এসেছিলেন রায় কী হয়, তা দেখতে ও শুনতে। রায় শুনতে এসেছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) আবু সাদিক কায়েম, জিএস (সাধারণ সম্পাদক) এসএম ফরহাদ, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিনসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা, জুলাই আন্দোলনের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ ইমাম হাসান তাঈমের বড় ভাই রবিউল আউয়াল, শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রবসহ আরও অনেকে।

রায়ের অপেক্ষায় কেটে যায় এক ঘণ্টা। দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ডায়াসের এসে মাইক্রোফোনে বলেন, ‘কোর্ট থেকে জানানো হয়েছে তাদের বসতে আর ১০ মিনিট সময় লাগবে।’ ১২টা ২৭ মিনিটে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন বিচারক এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। এরপর কয়েক মিনিট মানবতাবিরোধী পৃথক দুটি মামলায় প্রসিকিউশনের সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। একপর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর আবারও ডায়াসের সামনে গিয়ে বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। রায়টি সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চাইছি।’ আদালত আরজি মঞ্জুর করেন। এরপর সাড়ে ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এ মামলার সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। এরপর রায়ের এক অংশ পড়ে শোনার বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আরেক অংশ পড়েন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ। সাজা ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। জ্যেষ্ঠ বিচারক যখন শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা দেন, তারা তখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

কাঠগড়ায় যেমন ছিলেন চৌধুরী আল-মামুন : মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে দেশ জুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি। গতকাল সকাল ৯টার কিছু পর পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যানে করে তাকে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় আনা হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়। দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু আগে তাকে ট্রাইব্যুনালের ডকে (কাঠগড়া) হাজির করা হয়। এ সময় তিনি ছিলেন বিমর্ষ। রায় ঘোষণার প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় তিনি বসেছিলেন ডকে তাকে দেওয়া একটি চেয়ারে। এই পুরোটা সময়ের প্রায় সবটাই তিনি ছিলেন মাথা নিচু করে। শুনছিলেন রায়। যখন তার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পাঁচ বছর সাজার রায় ঘোষণা করেন, তখন তিনি ছিলেন নির্বিকার। রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আবারও ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

রায় ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, তল্লাশি-চেকপোস্ট : শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির রায় কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকে রাজধানী জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্টও ছিল। তবে সড়কে অন্যান্য দিনের তুলনায় ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। কারণ রায় ঘিরে গত কয়েক দিন বিভিন্ন এলালায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিকান্ড ঘটানো হয়। নাশকতার শঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছিল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে হাইকোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নেওয়া হয়েছিল ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সন্দেহভাজনদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করতেও দেখা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের চারদিক কড়া নিরাপত্তায় মোড়ানো হয়েছে। গেটের সামনে সেনাবাহিনীকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ও ভেতরে পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। হাইকোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকার নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আদালত প্রাঙ্গণ, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। সিসি ক্যামেরায়ও নজরদারি ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের।

যেভাবে বিচারের আওতায় শেখ হাসিনা : এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু (গত ৩ আগস্ট) ও যুক্তিতর্কের শুনানি পর্যন্ত (২৩ অক্টোবর) আড়াই মাস এবং বিচার শুরুর সাড়ে তিন মাসের মধ্যে রায় হলো। শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আসামিদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন দমনে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা, নির্দেশ প্রদান, রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা, সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় পাঁচ অভিযোগ আনা হয়। গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি ও সমাপনী বক্তব্য শেষে রায়ের তারিখ ধার্যের জন্য ১৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) ধার্য করেছিল আদালত। এরপর ১৩ নভেম্বর রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর (গতকাল) ধার্য করে আদালত।

গত ১২ মে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এতে ১৪ খন্ডে ১০ হাজার পৃষ্ঠার দালিলিক সাক্ষ্য জমা দেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে পত্র-পত্রিকা, দেশি ও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন, শহীদ ও আহতদের তালিকা, জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন বই ও স্মারকগ্রন্থ, ঘটনাস্থলভিত্তিক আন্দোলনে আহত নিহতের তালিকা, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বুলেট ব্যবহারের হিসাব সংবলিত জিডি ও প্রতিবেদন ইত্যাদি।

গত ১ জুন তিন আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। ১৬ জুন এক আদেশে আদালত দুজনকে আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়। তবে দুজনের কেউই ট্রাইব্যুনালে হাজির কিংবা আত্মসমর্পণ না করায় তাদের পলাতক দেখিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়।

                        দায়বদ্ধতা পরিশোধের যুগান্তকারী রায়: অ্যাটর্নি জেনারেল

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ডের রায় প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘এ রায়ে জুলাই শহীদ, রাষ্ট্র ও প্রসিকিউশন পক্ষ ন্যায়বিচার পেয়েছে। এই ন্যায়বিচারের মানদন্ড তৈরি হলো। এই মামলার দুজন আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, শহীদদের প্রতি, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি, গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসন, আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা পরিশোধের স্বার্থে এটি একটি যুগান্তকারী রায়। এই রায় প্রশান্তি আনবে।’ এ রায় ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ রায় বাংলাদেশের ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

যেদিন  শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হবেন সেদিন থেকে সাজা কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পলাতকদের ফিরিয়ে আনার বিষয়সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র আইনিভাবে যা যা করণীয় সব করবে। আর পলাতক থাকা অবস্থায় আপিল করার সুযোগ বিশ্বের কোনো দেশে নেই বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। এ রায়ের পর ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, সে বিষয়ে একটা বার্তা পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশে সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এই মামলার মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কোনো ইস্যু ছিল না বলে উনারা (ট্রাইব্যুনালের বিচারক) মন্তব্য করেননি।’

                                    এ রায় অতীতের প্রতিশোধ নয় : চিফ প্রসিকিউটর

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে দেওয়া মৃত্যুদন্ডের রায় ‘অতীতের কোনো প্রতিশোধ’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুভূতি হচ্ছে অবিমিশ্র। আমরা কারও মৃত্যুদন্ডে আনন্দিত যেমন নই, তেমনিভাবে এই বাংলাদেশে যেভাবে রাষ্ট্রের শাসক হয়ে দেশের নাগরিক বিশেষ করে তরুণ ছাত্র-জনতার রক্তে পা ভিজিয়েছিলেন (শেখ হাসিনা), বিচারের মাধ্যমে তাকে যে দন্ড দেওয়া হয়েছে আমরা বিশ্বাস করি এই দন্ড প্রদানের মাধ্যমে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের মীমাংসা হয়েছে এবং এই জাতির ন্যায়বিচারের প্রতি যে তৃষ্ণা সেটি আজকে সম্পন্ন হয়েছে। অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, এই রায়ে প্রসিকিউশনের খুশি বা অখুশির ব্যাপার নেই। আমরা বলব জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ১৪০০ তরতাজা তরুণ প্রাণ স্বৈরশাসনের অবসানের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের পরিবারে যদি সামান্য একটি স্বস্তি আসে সেটি আজকে প্রসিকিউশনের এই প্রাপ্তি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি এই রায়টি কোনো ধরনের কোনো অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি হচ্ছে জাতির প্রতিজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, এই রায় প্রমাণ করেছে অপরাধী যত বড় হোক, যত ক্ষমতাশাল হোক সে আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে যত বড় অপরাধীই হোক, তার অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে এবং তার প্রাপ্য শাস্তি পেতে হবে।

                                    মৃত্যুদন্ডে কষ্ট পেয়েছি : শেখ হাসিনার আইনজীবী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন আমির হোসেন। দুজনের মৃত্যুদন্ডের প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়টা আমার পক্ষে হয়নি, বিপক্ষে গেছে। এজন্য আমি ক্ষুব্ধ। কষ্ট লালন করছি। আসামিদের ফাঁসির রায়ে আমি কষ্ট পেয়েছি।’

মামলা চলাকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন কি না এমন প্রশ্নে অ্যাডভোকেট আমির হোসেন বলেন, ‘আমি চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করার কোনো বিধানও নেই। ওনারাও আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা এবং কোনো রকমের সহায়তা করেনি। প্রচ্ছন্নভাবেও যদি কোনো সহায়তা করতো সেটা আমার জন্য ভালো হতো, কিন্তু সেটা কেউ করেনি। আইনগতভাবে বিধানও নেই।’

রাজসাক্ষী আবদুল্লাহ আল-মামুনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উনি আমার মক্কেল না। ওনার সম্পর্কে আমার কোনো কথা বলাও ঠিক না। কারণ আমি যাদের পক্ষে মামলা লড়ি তাদের পক্ষেই আমার বলা উচিত। যে আমার আসামি না তার পক্ষে আমি কেন বলব, এটা বলা ঠিক না, এটা সমীচীন না।’

ন্যায়বিচার পরাজিত হতে পারে না : জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায়ের পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পৃথক অভিযোগে মৃত্যুদন্ড ও আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে। পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদন্ড এবং এ মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছর কারাদন্ডাদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেছেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হত্যাসহ পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালের প্ররোচনা, নির্দেশনায় এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ন্যায়বিচার এখানে পরাজিত হতে পারে না।’

আদালত জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘ, অধিকারসহ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন তুলে ধরে বলে, এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ করতে ভুক্তভোগীদের পরিবার, সাক্ষী ও দলিলাদির মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তা গ্রহণযোগ্য।

পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “গত বছর ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলেছেন। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। এ ঘৃণা থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর টার্গেট করে হামলা করা হয়েছে।” পর্যবেক্ষণে গত বছর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ এমন প্রসঙ্গে টেনে ট্রাইব্যুনাল বলে, এসব বক্তব্যের পরেই শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর যুবলীগ, ছাত্রলীগ হামলা চালায়।

পর্যবেক্ষণে গত বছর ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি এএসএম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনে ড্রোন দিয়ে চিহ্নিত করে হেলিকপ্টার থেকে মারণাস্ত্র দিয়ে আন্দোলনকারীদের গুলি করা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার টেলিফোনে কথোপকথনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘ফরেনসিক রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ কথোপকথনগুলো সঠিক এবং এগুলো এআইর (আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স) তৈরি নয়।’

এ মামলার রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তিনি দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তিনি হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষাভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেছেন, আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় প্রতিদিন কোর কমিটির মিটিং হতো। যেখানে আন্দোলন দমনের ছক তৈরি হতো। আদালত বলে, আমরা মনে করি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন পূর্ণাঙ্গ ও সত্য প্রকাশ করেছেন। আন্দোলনকারীদের কীভাবে হত্যার ছক তৈরি হয়েছিল তা প্রকাশ করেছে, যা আসামিদের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালকে সিদ্ধান্তে আসতে সহায়তা করেছে। আদালত বলে, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন যে অপরাধ করেছেন, তা সর্বোচ্চ সাজা (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) পাওয়ার মতো। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশ করায় তাকে পাঁচ বছর কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে আরও বলা হয়, ‘জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ মানুষ হত্যার কথা বলা হয়েছে। এখানে (ট্রাইব্যুনালে) যারা সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই হাত, পা ও চোখ হারিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্যে বোঝা যায় কোনো মানুষের পক্ষে এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে নীরব থাকা সম্ভব নয়। ন্যায়বিচার এখানে পরাজিত হতে পারে না।’