প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, রাজনৈতিক দল ও তাদের সদস্যদের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয়। দেশে চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে আলোচনা শুরু কিছুটা দেরিতে হলেও, কমিশন তা সম্পন্ন করছে। সিইসি আরও উল্লেখ করে বলেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন না দেয় বা বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠান অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে তৃতীয় দফার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুরে দ্বিতীয় অধিবেশনে জাকের পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, বাংলাদেশ উন্নয়ন দল, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেন।
সিইসি বলেছেন, বহুমাত্রিক প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি অত্যন্ত নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি এবং আন্তরিকতারও কোনো ঘাটতি নেই। কমিশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ভবিষ্যতে যত ধরনের চ্যালেঞ্জই আসুক, ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করার সক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশন উভয়েই জাতিকে একটি অবাধ, সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কমিশন দিনরাত কাজ করছে। বিভিন্ন বড় মাপের প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ, যা এ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি অতিরিক্ত বড় দায়িত্ব হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
জাকের পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার বলেন, নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। যারা ২০০-৩০০ কোটি খরচ করতে পারবে, নির্বাচন তাদের পক্ষে চলে যাবে। কালো টাকা-পেশিশক্তি বন্ধ না হলে ভোটকেন্দ্র দখল, ভোট ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটবে। এগুলো বন্ধ না করতে পারলে এ সংলাপ একটা জায়গায় এসে ফেইল করবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব আব্দুস সামাদ বলেন, একটি অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনীন নির্বাচন যদি না হয় তাহলে নির্বাচনী কালচার এ দেশ থেকে চিরতরে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, সাহস ও কৌশল যত বেশি মজবুত হবে, তার প্রয়োগিক কার্যক্রমগুলো তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। আমরা আশা করব এখনো সুযোগ আছে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হিসেবে প্রমাণ করার জন্য।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, আমরা জানতে পেরেছে জামানত বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমাদের গ্রামঞ্চলে অনেক মানুষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। তাদের কথা বিবেচনা করে জামানতের অর্থ যদি কমানো যায়, তাহলে তারা নির্বাচনের সুযোগ পাবে। এ সময় তিনি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও লাইভ স্ক্রিনে ভোট দেখার ব্যবস্থার আহ্বান জানান।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ভুয়া ভিডিও ও বিকৃত কনটেন্ট ছড়িয়ে তাকে সামাজিকভাবে বিভ্রান্ত ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। অথচ এসব প্রতিরোধে ইসির বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। কীভাবে করবেন বন্ধ? কিছু একটা করে দেখান না। আপনি যদি এটা এখনই করতে না পারেন, আমি কনফিডেন্স পাব কীভাবে?
বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি। জনগণের কাছে পৌঁছাতে পোস্টার ব্যানার কার্যকর প্রচারণা হাতিয়ার, যা ছাড়া অনেক এলাকায় জনসংযোগ কঠিন হয়ে যায়। তাই এগুলো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সভাপতি আবু লায়েস মুন্না বলেন, সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করে নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধান সংস্কার জরুরি। তার মতে, এমন পরিষদ থাকলে মাসব্যাপী সংলাপের প্রয়োজন পড়ত না।
বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে দলগুলোকে আচরণবিধি মানানো হবে কীভাবে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনার নজির অতীতে নেই; তাই কমিশনের কঠোর ক্ষমতা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আচরণবিধি লঙ্ঘন চিহ্নিত করা সহজ; তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত লঙ্ঘন যেন না ঘটে বা কম ঘটে। আচরণবিধির ব্যাপক প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটরিং এবং লঙ্ঘন শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।
খেলাফত মজলিশের যুগ্ম মহাসচিব মুনতাসীর আলী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে যৌথ বাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনের তিন দিন আগে সেনা মোতায়েন এবং কালো টাকার প্রভাব বন্ধে ইসির নিজস্ব গোয়েন্দা টিম রাখার দাবি জানান।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, বর্তমান কমিশনের বার্তা স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন করলে কেউই পার পাবে না এবং কোনো বিষয়ে কমিশন আপস করবে না। আরপিও, আচরণবিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন শক্তিশালী করে কমিশন এখন কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। মাঠপর্যায়ে ভিজিলেন্স টিম, মনিটরিং টিম, আইনশৃঙ্খলা সেল, ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি টিম ও কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষক দল সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে। প্রতিটি আসনে দুই দল জুডিশিয়াল অফিসার কাজ করবে; জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা তাৎক্ষণিক বিচার এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন।’
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এবার রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি মানাতে অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে এটি এক ধরনের স্মারক ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপায়। মসজিদ, মন্দির, কেয়াং, গির্জা, সরকারি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ সময় নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমেদ বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় সবার সহযোগিতা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠিন হলেও জাতি একসঙ্গে দাঁড়ালে সফলতা সম্ভব, যেমন শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আপনারা সহযোগিতা করলে আলহামদুলিল্লাহ আর অসহযোগিতা করেন তো ইন্নালিল্লাহ।