সকালে ঘুম থেকে উঠে চা হাতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, পাশের বাড়ির একজন বৃদ্ধা একা বাড়ির পাশে গাছের শুকনো পাতাগুলো একত্রিত করছেন এক জায়গায়। শীতের শুরুতে এখানেও সব গাছের পাতা হলুদ বর্ণের হয়ে গাছ থেকে ঝরে যায়। বাড়ির পাশের বাইরের সবটুকু জায়গা জুড়ে ফেলে ঝরা শুকনো পাতা। এগুলো পরিষ্কার না করলে বৃষ্টি বা স্নোতে আরও বেশি বিশ্রী হয়। ফলে সবাই এ সময়ে যার যার বাড়ির পাশের শুকনো পাতা একপাশে জড়ো করে পলিথিন ব্যাগে ভরে রাখে। প্রতি সপ্তাহে নগর প্রশাসন অন্যান্য আবর্জনা (গার্বেজ) নেওয়ার সময় সেই ব্যাগগুলোও নিয়ে যায়। দেখছিলাম পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মহিলা তার বাসার সেই শুকনো পাতা সরাচ্ছেন নীরবে একা। প্রায় দুই যুগের বেশি সময়ের প্রতিবেশী। তাই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে। ভীষণ নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও পরোপকারী এই চায়নিজ পরিবারের ভদ্রমহিলা। বেশ কয়েক বছর আগে, তার স্বামী ইন্তেকাল করেন। ছেলেমেয়েরা আছে, যে যার মতো করে যার যার জায়গায়। মাঝে মাঝে ওরা আসে মাকে দেখতে। মাও যান ওদের দেখতে। বাকিটা সময় ভদ্রমহিলা একা থাকেন। বয়স সম্ভবত ৮০-এর কাছাকাছি। প্রচ- পরিশ্রমী তো বটেই। বাড়ির যাবতীয় কাজ একা করেন। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যখানে এটাও এক সময়। পৃথিবীতে আসলে কেউ কারও জন্য থাকে না। সবাই নিজের জন্যই থাকি। একটা সময় কেউ কারোর জন্য কিছু করেও দেয় না। নিজেরটা নিজেরই করতে হয়। সবকিছু একটা নির্দিষ্ট সময়ে বন্দি। হঠাৎ মৃত্যু আসে। সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে হয়। চলেও যাই। তাই মনে হচ্ছিল, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যখানে আসলে কী! অপেক্ষা? অপেক্ষার সময়টুকু নানা কাজে চলে যায়। কাজগুলো কী! সেই কাজ কেন ও কীভাবে করি। কেন করি?
প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝে মনকে নাড়া দেয়। আমরা যে যেখানেই থাকি, যাই করি সবকিছুর পেছনে একটা মহাপরিকল্পনা কাজ করে। সেই মহাপরিকল্পনাটা নিজে করতে পারি না, নিজে প্ল্যান করি, কিন্তু আমাদের সবার জন্য ‘গ্রেট প্লান’ করে রেখেছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। একটা কথা আছে, ‘ম্যান প্রপসেস, গড ডিসপোসেস’। মানুষ পরিকল্পনা করে আর বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা করেন মহাপরিকল্পনা। আমরা সেই মহাপরিকল্পনার একটা রহস্য, কঠিন প্রশ্ন ও বিভ্রান্তিও। পশ্চিমের দেশে শীতে পাতা কুড়ানো তেমনি একটা পাজল। আমাদের জাগতিক রাজনীতিও আরেক পাজল। দেশে-বিদেশে এই রাজনীতির বিচিত্র ও বৈচিত্র্য কখনো কখনো অবাক করে। বাকরুদ্ধ করে দেয়। রাজনীতিকে আদর্শিকভাবে চিন্তা করি। মানুষের জন্য এটি মানুষের সেবা। কিন্তু রাজনীতি এখন দেশ ও বিদেশে অধিকাংশ সময়েই মনে হয় প্রতারণা। একে অন্যকে ঠকানো। একে অন্যের ব্যাপারে ও তার সঙ্গে অন্যায় ও মিথ্যাচার করা। দুর্নীতি করা, অসভ্যতামি। চুরি, মিথ্যা বলা ও তা প্রচার করা। আজকাল চুরির অসংখ্য কৌশল ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই চুরির কৌশলের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন কৌশল ‘এ আই’। অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এর দ্বারা এমন কিছু ছবি বা এমন কিছু ঘটনা ও কথা সামনে উপস্থাপন হয় যে, সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হই। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা ছবি আসে। বাংলাদেশে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি প্রফেসর ডক্টর আলী রীয়াজ ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তার নির্দিষ্ট সময় শেষ করে পরিবারে ফিরে আসছেন। ‘এ আই’ ছবিতে দেখানো হয়, ড. রীয়াজ বিমানের ফার্স্ট ক্লাসে পালিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম কথা, ছবিটা হুবহু মিথ্যা একটা ছবি। প্রফেসর রীয়াজ তার নির্দিষ্ট সময় দায়িত্ব শেষ করে অবশ্যই ফিরে আসবেন। তিনি ফিরে আসছেন তার পরিবারে, পালিয়ে না। পালানোর প্রশ্নই বা কেন, তার বিরুদ্ধে কি কোনো মামলা আছে? না তিনি কিছু চুরি করে আসছেন বা কাউকে হত্যা করে?
ছবির ক্যাপশনে তাকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা ও লেখা হয়। প্রথম মিথ্যাচার। এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রফেসর রীয়াজ তার ওপর অর্পিত ঐকমত্য কমিশনের দায়িত্ব ৩০ অক্টোবরের পর শেষ করে একবারে ফিরে আসতে পারতেন যুক্তরাষ্ট্রে, বাংলাদেশে আর না ফিরে গিয়ে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা প্রফেসর রীয়াজ শুধু তার পরিবারের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার জন্য আসেননি। তার কিছু অফিশিয়াল কাজ আছে এখানে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি একজন ডিসটিংগুইস প্রফেসর। এখানে তার ছুটি সংক্রান্ত কিছু দাপ্তরিক কাজ রয়েছে। আগামীকাল ২০ নভেম্বর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা প্রফেসর রীয়াজের, পরবর্তী দায়িত্ব পালনে। দ্বিতীয় মিথ্যা, প্রফেসর রীয়াজ কখনোই বিমানে প্রথম ক্লাসে ভ্রমণ করেন না। এটা আরেক মিথ্যাচার। তৃতীয় মিথ্যা, প্রফেসর রীয়াজ কোথাও ভ্রমণে গেলে সুটেড-বুটেড হয়ে ভ্রমণ করেন না। এটা তার প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং মিথ্যা প্রচারের কারণে এ ধরনের ‘এআই’ ছবি যুক্ত করে বিষয়টা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করার উদ্দেশ্যকে, নিশ্চয়ই কোনোভাবে সাধুবাদ দেওয়া যায় না। দেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। এ ছাড়া বিষয়টা নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে যেসব ভুল এবং মিথ্যা তথ্য প্রচার হচ্ছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। যারা এগুলো করছেন তাদের একটা দুর্গন্ধযুক্ত চিন্তা, ইচ্ছা ও পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এটা করে তারা নিজেরাই যে নিজেদের চিন্তার গায়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছেন, এই অনুধাবন কম। প্রফেসর রীয়াজের জন্য মানহানির মামলা করতে পারেন। কিন্তু মনে হয় না সেটা তিনি করবেন। অসুরের সঙ্গে সুরের যুদ্ধ কি হয়, না শোভা পায়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বিষয়ে এই কমিটির পেছনে খরচ ও ব্যয়ের প্রশ্নেও মিথ্যা প্রচার চলছে। স্থানীয় (নিউ ইয়র্ক) টেলিভিশনের এক টকশোর প্রশ্নে কমিটির ব্যয় প্রমাণের কথা বলি। দুর্ভাগ্যবশত অনেকে যারা কথাটা শুনেছেন, ভুল শুনেছেন। বোঝাতে পারিনি হয়তোবা। বলেছি ‘যারা’ ‘অভিযোগ’ তুলছেন তাদের অভিযোগের প্রমাণ দিতে, সেটা নিয়ে! অনেক বিজ্ঞ বন্ধু কথাটা ভুল শুনেছেন বা ভুল বুঝেছেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যের, তবু দুঃখিত, বোঝাতে পারিনি, তাই। এ রকমভাবে আমরা একে অন্যকে ভুল বুঝি, ভুল পড়ি ও ভুল শুনি। এখানে প্রয়োজন একের প্রতি অন্যের আস্থা, বিশ্বাস ও সেই শেকরকে বোঝা। আমাদের দূরদৃষ্টির সীমাবদ্ধতা থাকে বলেই, অনেকে অনেককে ভুল বুঝে ফেলি চট করে। নিজের কোনো না কোনো আবেগের কারণে। সংক্ষিপ্ত এ জীবনে এ রকম আবেগ ও ভুল বোঝা, কারও জন্যই কল্যাণ আনে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পেছনে, বিভিন্ন সময় সত্য প্রচারের সঙ্গে মিথ্যা প্রচারের ভা-ার এবং কৌশল এখন এতবেশি সমৃদ্ধ যে, সেটা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে বাকরুদ্ধ হই। যারা রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে নানা দ্বন্দ্ব ও হিংসা-প্রতি হিংসায় লিপ্ত হই ও হন, তাদের মাঝে একটা চিন্তা হয়তো কখনোই আসে না আজকের এ দিনই শেষ দিন না। আমাদের কারও জীবন অফুরন্ত না। এই আছি তো এই নেই। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা খুব লম্বা নয়। এ বিষয়ে যদি একটু যতœবান হতাম চিন্তা ও কাজে; আমাদের অর্ধেক অন্যায়, অবিচার ও মিথ্যাচারের প্রবণতা, হয়তোবা একটু কম হতো। এ জীবনের দিনগুলো গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ওই জীর্ণ পাতার চেয়ে খুব বেশি কিছু না। জীবন কিন্তু এই একটা না! মৃত্যুতে শুরু হয় আরেক পর্বের। এরপরও আরেকটা অধ্যায় আছে জীবনের। এ সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্যপ্রমাণ না থাকলেও, অনেকের এ ‘বিশ্বাস’ আছে।
জীবনের চারদিকে অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তাকালেও এ বিশ্বাস হয়। জীবন ও মৃত্যুর মাঝে যা আছে বা যা থাকে সেটা অনির্দিষ্ট অপেক্ষার পাজল অনেক কিছুর সঙ্গে এক সঙ্গে লেখা। এটা কোনো আধ্যাত্মিক দর্শন বা ভাবদর্শন না। এটা বাস্তবতা। এই বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত কেবল জাগতিকতা নয়, জাগতিকতার অনেক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত। আমরা সত্যিকার অর্থে কিছুর কল্যাণ আশা করলে নিজেরা নিজেদের পরিবর্তন করব ভেজালে নয়, নির্ভেজাল সংস্কৃতিতে। একশভাগ নির্ভেজাল মানুষ হয় না, হওয়া সম্ভব না। কিন্তু সেই ‘ভেজালের’ পরিমাণ যদি একশ ভাগের ৭০ ভাগ হয়, সেটা দ্বারা কোনো কাজ বা চিন্তা ইতিবাচক রাখা সম্ভব না। আমাদের কাজ এবং চিন্তা যদি ইতিবাচক কম হয় তাতে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ হয় না। প্রত্যেকের জীবনের শুরু এবং শেষের মাঝখানের সময় ও কাজ কী? এটা নিয়েও ভাবা দরকার। আমাদের সামাজিক শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, নীতি-নৈতিকতার বৈশিষ্ট্য এর মাঝে আছে। যেকোনো ভাবাদর্শন বা রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতি-নৈতিকতার সৌন্দর্য এর নন্দনতত্ত্ব এবং শিল্প দর্শন। বিষয়গুলো যখন কোনো কাজ, চিন্তা এবং ভাবাদর্শে লঙ্ঘিত হয় বা উচ্ছৃঙ্খলিত হয়, কিংবা বিকৃত হয়, তখন সেটা কোনো কল্যাণ বা সুভবিষ্যৎ নির্মাণ করে না। এ জন্য মানুষের শুধু ‘জাগতিকতা’ চিন্তাই প্রধান ভূমিকা ও প্রভাব রাখে না। জাগতিক জীবনের পরের অদৃশ্য জগতের একটা নন্দনতত্ত্ব ও শিল্প দর্শন আছে। মৃত্যু ও মৃত্যু উত্তর অজানা জগৎ, সেই নন্দনতত্ত্বের এক বড় শিল্প দর্শন।
চিন্তা ও সেবার আদর্শ ও অনুভবকে দূরে সরিয়ে কোন্দল এবং বিভ্রান্তির বিশাল নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে। সুযোগ সন্ধানীরা দেশে ও প্রবাসেও তার ওপর ভর করে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য সফল করতে চেষ্টা করে। অতীতেও করেছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে তারা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরিণত করার পেছনে উল্লিখিত অসৎ ও কুরুচিকর উদ্দেশ্য সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে। বিগত সরকারি দল আওয়ামী লীগের নানা কর্মী ও নেতা দেশ ও বিদেশে। তাদের মিথ্যা প্রচার ও প্রসারে গলাবাজির উচ্চকণ্ঠ এখনো শুনি। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ায় নানাজনের নানা অভিনয়, কথা ও কলামেও এদের ভাইরাল হয়ে যাওয়ার অপ-প্রতিযোগিতা দেখি। এ ব্যাপারে আমাদের চেতনা জাগ্রত থাকা দরকার। আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে বেশ কিছুদিন থেকে। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিন। কারও কারোর আবার আত্মঘাতী পরিকল্পনা। সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারকেও এটি চ্যালেঞ্জের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য রাজনৈতিক দল শুধু না, আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ, শিক্ষিত সমাজ ও বাবু সমাজের অনেকেই দায়ী। শুধু ক্ষণস্থায়ী জাগতিকতার উল্লাস, ভন্ডামি, চরম মিথ্যাবাদিতার আনন্দ দিয়ে রাজনীতির সুরক্ষা হয় না। শুধু এ জীবন না, জীবনের শুরু ও শেষের মধ্যকার সময়ের অংক কী, ইতিহাস কী, লক্ষ্য কী ও পরিণতী কী? ভাবা দরকার। এমন ভাবনার নামই সুচিন্তা।
লেখক: রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক
mahmud315@yahoo.com