মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর ৩০ দিন) আপিল না করলে তারা গ্রেপ্তার হলেই সাজা কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। তবে আপিল বিভাগ কমপ্লিট জাস্টিসের স্বার্থে বিলম্ব মওকুফ করলেও করতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম জানান, শেখ হাসিনা ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের রায়ের অনুলিপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাবে ইন্টারপোলে। আর এ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লিখিত জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের কোনো দণ্ডের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা যাবে এবং তা করতে হবে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে। পলাতক শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে প্রসিকিউটর তামীম বলেন, ‘যেসব আইনের আপিলের (সাজার বিরুদ্ধে) সময়সীমা বর্ণনা করা নেই, সেসব আইনে আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় তামাদি আইন অনুযায়ী। আর তামাদি আইন অনুযায়ী যেসব আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ হয় সেখানে আপিলের সময় পার হলেও আইনের ৫ ধারায় এ বিলম্বটা মওকুফের সুযোগ আছে। কিন্তু বিশেষ আইনগুলোতে বলা আছে এ পিরিয়ডটা পার হলে বিলম্ব মওকুফের সুযোগ নেই। অর্থাৎ, এই ৩০ দিন পার হয়ে গেলে পরবর্তী যে অতিরিক্ত দিনগুলো মওকুফ করার আবেদনের কোনো সুযোগ নেই। সরকার তখন এটি (সাজা) কার্যকর করবে। আইন অনুযায়ী ৩০ দিন পার হলে এবং তারা গ্রেপ্তার হলে রায় কার্যকর করা হবে।’
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান যদি আপিল করেন তাহলে কোনো সুযোগ থাকবে কি না, এমন প্রশ্নে প্রসিকিউটর তামীম বলেন, ‘আপিল বিভাগের একটি অথরিটি আছে, কমপ্লিট জাস্টিস করা। আইনে নেই কিন্তু উনারা (আপিল বিভাগ) কমপ্লিট জাস্টিসের জন্য এটা (আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ) করলেও করতে পারেন। কিন্তু আইনে পরিষ্কার বলা আছে, যদি কোনো বিশেষ আইনে আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকে সেটা পার হয়ে গেলে আর এ সময় মওকুফ করা হবে না।’
অ্যাডভোকেট তামীম বলেন, ‘রায়ের শেষদিকে উল্লেখ আছে এ রায়ের একটি কপি পাবে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। একটি পাবেন এই মামলায় কারাগারে থাকা আসামি এবং আরেকটি যাবে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। এ ছাড়া যে আসামিরা পলাতক আছেন তারা যদি ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ কিংবা গ্রেপ্তার হন তাহলে তারাও রায়ের কপি পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘রায় তো কালকে হয়েছে, রায়ের কিছু অফিশিয়াল কার্যক্রম থাকে, সেগুলো সম্পন্ন হলেই অনুলিপিগুলো এসব জায়গায় পাঠানো হবে।’
প্রসিকিউটর তামীম বলেন, ‘আমরা যেটা করব, যে দুজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি (শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান) এখনো পলাতক, তাদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার একটি কপিসহ রেড নোটিস যেহেতু আগেই জারি করা আছে; সেটাকে মোডিফাই করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বদলে দোষী সাব্যস্ত ও সাজা পরোয়ানা মূলে তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি ইন্টারপোলের নোটিস জারির জন্য আবেদন করব। আর এ আবেদনটি করা হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। এটা করবে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। এটার কাজ শুরু হয়ে গেছে। রায় হাতে পেলেই আমরা এটা পাঠিয়ে দেব।’
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে প্রথম ক্ষতিপূরণের রায় প্রদান করা হয়েছে। আইনে বলা আছে, ট্রাইব্যুনালের সব রায় সরকার পদক্ষেপ নেবে। এখন এ রায়ের কপি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গেলে ওনারা সিদ্ধান্ত নেবেন রায়ের কোন অংশ কীভাবে কার্যকর হবে।’
৩০ দিনের মধ্যে জামিনের আবেদন করতে পারবেন মামুন : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তার পাঁচ বছরের সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন। প্রসিকিউটর এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল আইনে আছে, কোনো আসামি যদি ফুল অ্যান্ড ট্রু ডিসক্লোস (ঘটনার সত্য ও পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ) করেন তাহলে ট্রাইব্যুনাল তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। ক্ষমা তো মানে হলো একদমই ক্ষমা করে দেওয়া। কাউকে ক্ষমা করলে তো আর ভেতরে কিছু থাকে না। কিন্তু পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, অপরাধের নৃশংসতাটা খুবই মারাত্মক। সেজন্য তাকে পুরোপুরি ক্ষমা না করে তাকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে নমনীয় হয়েছেন। যার কারণে তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ওনাদের (দণ্ডিতদের) এখন যত চাওয়া সেটা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগে। সেখান গিয়ে ওনারা আপিল ফাইল করতে পারবেন।’
মামুনের লঘু সাজা নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের অসন্তুষ্টির বিষয়ে প্রসিকিউটর তামীম বলেন, ‘এখানে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন একজন আসামি। তাকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। এ মামলায় তিনটি পক্ষ আপিল করতে পারে। আসামিপক্ষ, প্রসিকিউশন ও সরকারপক্ষ। চাইলে যেকোনো পক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারবে।’
ট্রাইব্যুনালের রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ও প্রহসন উল্লেখ করে শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রসিকিউটর তামীম বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) এ বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই। তার মানে হলো উনি এই রায় ও প্রসিডিং (আইনি প্রক্রিয়া) সম্পর্কে জানতেন। এখন উনার জন্য সুযোগ হলো, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তাকে আত্মসমর্পণ করে আপিল বিভাগে আপিল ফাইল করবেন এবং আপিলে উনার সব কথা বলবেন। আপিল বিভাগ দুই পক্ষকে শুনে যথার্থ ন্যায়বিচার করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই রায়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত নয়। কারণ, আমাদের ট্রাইব্যুনালের বিচার এতই স্বচ্ছ হয়েছে যে, পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এখানে যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যদি সেসব আদালতে দেওয়া হয় তাহলে সব চ্যালেঞ্জ উতরে যাবে এবং এখানে যে রায় প্রদান করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেই শাস্তি সেখানেও হবে।’
ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল শুনানি হয়নি : এদিকে গত বছর ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় গতকাল সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। প্রসিকিউশন পক্ষে মামলার দায়িত্বে থাকা প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। আদালত থেকে আমাদের জানানো হয় শুনানি হবে না। আগামীকাল (আজ) শুনানি হবে।’
এ মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মো. আবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতে যাওয়ার পর জানতে পারি বেলা পৌনে ১২টায় শুনানি হবে। পরে জানতে পারি আদালত শুনানি মুলতবি করে বুধবার (আজ) ধার্য করেছেন।’