যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব পারমাণবিক প্রকল্প এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনাবেচা নিয়ে চুক্তি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সফররত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকের পর হোয়াইট হাউজ এ তথ্য জানাল। হোয়াইট হাউজ জানায়, দুই দেশ পারমাণবিক শক্তি বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেছে। এই ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বহু বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক প্রকল্পে সহযোগিতার আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। এতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের বিষয়টি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। সৌদি আরবকে সামরিক জোট ন্যাটোর বাইরে প্রধান মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়াচ্ছে সৌদি আরব। দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এই ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ ৬০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারে নেওয়া হবে। অন্যদিকে সৌদি যুবরাজের এই সফরের শুরু থেকে সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ড ফের আলোচনায় এসেছে। যদিও হত্যাকাণ্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ঠিক উল্টো কথা বলেছেন ট্রাম্প। সে হত্যাকাণ্ডে সালমানের সম্পৃক্ততার তথ্য থাকলেও; অভূতপূর্বভাবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না সৌদি যুবরাজ। তবে জামাল খাসোগি হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তার স্ত্রী হানান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদির সঙ্গে একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদনের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে উন্নত মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়া হবে। মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটন সফরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব আমেরিকার ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখে। সাত বছর পর হোয়াইট হাউজে প্রথম সফরে বৈঠককালে তিনি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা নিয়ে কয়েকটি চুক্তি করেন। যুবরাজ হোয়াইট হাউজের ডিনারে সংক্ষিপ্ত ভাষণে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ৯ দশক ধরে একসঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু আজকের দিনটি ছিল বিশেষ দিন। মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিগন্ত অনেক বড় এবং বিস্তৃত। আমরা কিছু চুক্তিতে সই করছি, যা সম্পর্ক উন্নয়নের দরজা খুলে দেবে। হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশ বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানিসংক্রান্ত একটি ‘যৌথ ঘোষণা’ অনুমোদন করেছে। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের জন্য শতকোটি ডলারের পারমাণবিক জ্বালানি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। ‘পারমাণবিক শক্তির বিস্তার রোধ’-সংক্রান্ত কঠোর নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে এটা করা হবে।
মঙ্গলবার ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে সালমান বলেন, আমার মনে হয়, আজ বা আগামীকাল আমরা ঘোষণা করতে পারব যে এই ৬০০ বিলিয়ন ডলারের প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমরা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে যাচ্ছি। এমবিএস জানান, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে দুই দেশ বহু চুক্তি স্বাক্ষর করবে, যা বড় ধরনের বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি করবে। এ সময় ট্রাম্প কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, মানে আপনি বলছেন, ৬০০ বিলিয়ন এখন ১ ট্রিলিয়ন হবে? জবাবে এমবিএস বলেন, নিশ্চিতভাবেই, কারণ আজ যে চুক্তিগুলো আমরা করছি, সেগুলোই এ বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সহজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত প্রিন্সেস রিমা বিনত বান্দার আল সউদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠককে ‘সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, দুই দেশ কয়েকটি বড় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। যদিও এসব চুক্তির বিস্তারিত তিনি উল্লেখ করেননি। এ সময় সৌদি আরবকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বাইরে প্রধান মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আলোচনায় খাসোগি হত্যাকাণ্ড
২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কিছুই জানতেন না। গত মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) এমনটাই দাবি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র সফররত যুবরাজের প্রতি ট্রাম্পের এই সমর্থন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুবরাজ খাসোগিকে ‘গ্রেপ্তার বা হত্যা’ করার পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছিলেন। বিন সালমানকে পাশে বসিয়ে সংবাদমাধ্যমকে ট্রাম্প বলেন, আপনি যে ভদ্রলোকটির কথা বলছেন, তাকে অনেকেই পছন্দ করতেন না আপনি তাকে পছন্দ করুন বা না করুন, ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, এবং আমরা এটুকু বলেই শেষ করতে পারি। সৌদি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক জামাল খাসোগি ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে খুন হন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর স্বামী হত্যার ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করতে ট্রাম্পের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন জামাল খাসোগির স্ত্রী হানান আলআতর খাসোগি।