গণতন্ত্রের স্বার্থে মব ভায়োলেন্স থেকে সরে আসতে হবে

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের প্রধানতম কথা হচ্ছে, আপনাকে অন্যের মতো সহ্য করতে হবে। আপনার কথা সহ্য করব না, পিটিয়ে দেব, মব ভায়োলেন্স তৈরি করব, কিছু মানুষ জড়ো করে বলব যে ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, তাকে মেরে ফেল পিটিয়ে, দিস ইজ নট ডেমোক্রেসি। ডেমোক্রেসির মূল কথাটা হচ্ছে, আমি তোমার সঙ্গে একমত না হতে পারি কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের যে স্বাধীনতা তাকে আমি আমার জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব। দ্যাট ইজ ডেমোক্রেসি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা এখানে অন্যের মতকে সহ্য করতে চাই না, আমরা তাকে উড়িয়ে দিতে চাই। এই জায়গা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।’

গতকাল বুধবার দুপুরে গুলশানে লেকশোরে ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি’ শীর্ষক সংকলিত গ্রন্থের প্রকাশনা উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন। এর আগে গণঅভ্যুত্থানের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা হয়।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই যদি আমরা টেকসই একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই, ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে না চাই, তাহলে গণতন্ত্রকে আমাদের এখানে প্রতিপালন করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্মাণ করতে হবে। কোন দল কে জিতল, কে হারলো, এটা জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানটা শক্তিশালী হলো কি না। আমাদের জুডিশিয়ারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কি না, আমাদের মিডিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্ট কি না, পার্লামেন্ট ইফেক্টিভ কি না, দেশ আইনের শাসনে চলছে কি না, সুশাসন চলছে কি না, মানুষের সামাজিক মর্যাদা সুরক্ষা এবং মানবাধিকার আমরা রাখতে পারছি কি না।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন আসছে। বিএনপির উপরে দায়িত্ব বেশি পড়েছে। বিএনপিকে সত্যিকার অর্থেই এমন একটা মোর্চা গড়ে তুলতে হবে যে মোর্চা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে অতীতে, লড়াই করবে এবং গণতন্ত্রকে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এই মোর্চাই আমাদের এখানে গড়তে হবে। আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তার দিকে তাকালেই তো আমরা উত্তরটা পেয়ে যাই। যিনি গণতন্ত্রের জনে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে আনার জন্য কত নির্যাতন সহ্য করেছেন। এখনো অসুস্থ অবস্থায় এই গণতন্ত্রের কথাই বলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্ট তিনি (খালেদা জিয়া) একটা খুব ছোট্ট একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন। ওই বিবৃতিতে খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন আমরা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে সবাই এক যোগে কাজ করি। এই যে আপনার ধারণা এটাকে আমাদের মূলত কাজে লাগাতে হবে। আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। মনে করি যে আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেব তিনি নির্যাতিত হয়েছেন, তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে প্রামাণ্য চিত্রে তার বক্তব্য আপনারা দেখেছেন কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি মানুষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সুতরাং আমাদের দায়িত্ব যে আমরা সবাই অন্তত গণতন্ত্র যারা বিশ্বাস করি, সবাই একজোট হয়ে সামনের দিনগুলোতে শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচনের পরবর্তী সময় যেন গণতন্ত্রকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারি তার জন্য একযোগে কাজ করতে হবে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমার মাঝেমধ্যে একটু হতাশ লাগে, যখন বাংলাদেশে চারদিকে দেখতে পাই। যখন দেখি ফ্যাসিস্ট হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের জনে রায় দেওয়া হচ্ছে কোর্টে, অন্যদিকে দেখি মব ভালোলেন্স চলছে। এটা কীসের আলামত আমি জানি না। ওই রায়ের যে গুরুত্ব সেটাকে কমিয়ে দেওয়ার জন্য একটা বিশেষ মহল ভিন্ন খাতে বিশ্ব দৃষ্টিকে নেওয়ার জন্য এই কাজগুলো করেছে। এই বিষয়গুলো আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়। বিএনপি একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এখানে নিঃসন্দেহে যারা বিভিন্ন মতবাদে বিশ্বাস করেন করতে পারেন। কিন্তু আমরা বিএনপি আমরা খুব পরিষ্কার ভাষায় আমরা বলতে চাই, উই আর লিবারেল ডেমোক্র্যাটস। এতে আমাদের ভুল বোঝার কোনো সুযোগ আমি দিতে চাই না। আমরা সবাইকে নিয়ে এই ভূখণ্ডে যারা বাস করি তাদের সবাইকে নিয়ে সব ধর্ম, সব বর্ণ, সব মত সবাইকে একসঙ্গে করে আমরা একটা রেইনবো স্টেট নির্মাণ করতে চাই। এটা আমাদের ঘোষিত নীতি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গ্রন্থের সম্পাদক বাবুল তালুকদার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।