সেঞ্চুরি টেস্টে সেঞ্চুরির অপেক্ষায় মুশফিক

মাত্র ১ রানের জন্য ১০০-তে ১০০ হলো না মুশফিকুর রহিমের। ঢাকা টেস্টের প্রথম দিন শেষে মুশফিকুর রহিম ৯৯ রানে অপরাজিত। তার ১০০তম টেস্টকে ঘিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ক্রীড়া সাংবাদিক, সমর্থক গোষ্ঠী সবারই ছিল বিশেষ আয়োজন। সকালের সেই উৎসবমুখরতা পূর্ণতা পেত মুশফিক যদি টেস্টের সেঞ্চুরির দিনেই ক্যারিয়ারের ১৩তম সেঞ্চুরিটা পেয়ে যেতেন, ইতিহাসের মাত্র ১১তম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০তম টেস্টে সেঞ্চুরির কীর্তি গড়তেন। সেই সুযোগ এখনো আছে, তবে মাঝখানে ঢুকে গেছে নির্ঘুম এক রাত। মিরপুরে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষে, বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯০ ওভারে ৪ উইকেটে ২৯২ রান। মুশফিক অপরাজিত ৯৯ রানে, তার সঙ্গী লিটন দাস অপরাজিত ৪৭ রানে।

মুশফিকের শততম টেস্টকে ঘিরে আয়োজন ছিল অনেক। মুশফিককে টেস্ট অভিষেকে টুপি পরিয়ে দিয়েছিলেন তখনকার অধিনায়ক হাবিবুল বাশার, শততম টেস্টে বিশেষ টেস্টক্যাপটাও তিনি পরিয়ে দিলেন মাথায়। বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তার হাতে তুলে দিয়েছেন সবার সই করা জার্সি। ছেলেকে পাশে আর মেয়েকে কোলে নিয়ে মুশফিক জানিয়েছেন

কৃতজ্ঞতা, উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী, বাবা, মা আর দীর্ঘদিনের সতীর্থ ও ভায়রা ভাই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও। প্রথম দিনের খেলা শেষে মুশফিকের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। মিরপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারির একটা অংশে মুশফিকের ১০০তম টেস্টের বড় একটা ব্যানার, প্রবেশপথেও বড় বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে মুশফিকের ১০০ টেস্ট খেলার কীর্তিকে উদযাপনের অনেক আয়োজনই ছিল, শান্ত টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে সেই আয়োজনে যোগ করেছেন প্রাসঙ্গিকতা। কেমন লাগত যদি দেখা যেত মুশফিকের ১০০তম টেস্টের প্রথম দিনে খেলা দেখতে আসা তার পরিবার ও ভক্তরা সারা দিন ধরে আয়ারল্যান্ডের ব্যাটিং দেখে বাড়ি ফিরতেন! তেমনটা অবশ্য হয়নি, তবে উৎসবটা হতে পারত আরও রঙিন। দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, তিনজনই আউট হন মধ্যাহ্ন বিরতির আগে। বিরতির কিছু আগে ব্যাটিংয়ে নামেন মুশফিক, লাঞ্চ ব্রেকে বাংলাদেশ ৩১ ওভারে ৩ উইকেটে ১০০ রান।

দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলা দুই ক্রিকেটার মুশফিক ও মমিনুল হক দিনের দ্বিতীয় সেশনটাতে ছড়ি ঘুরিয়েছেন আইরিশ বোলারদের ওপর। আইরিশরা রক্ষণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়ে ব্যাটসম্যানদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে, সেই পরীক্ষায় দিনের দ্বিতীয় সেশনে উত্তীর্ণ দুই অভিজ্ঞ মুশফিক ও মমিনুল। চা-বিরতিতে মমিনুল ৬২, মুশফিক ৪৮। বাংলাদেশ ১৯২/৩। চা-বিরতির পরপরই পা বাড়িয়ে সুইপ করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন মমিনুল। অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইনের ঝুলিয়ে দেওয়া বল ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে জুতোয় লেগে ওপরে উঠে যায়, স্লিপ ফিল্ডার অ্যান্ডি বলব্রাইন বল ধরতে কোনো ভুলই করেননি। মমিনুলের বিদায়ে উইকেটে আসেন বিকেএসপির আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী লিটন কুমার দাস। দিনের বাকি সময়টা তিনিই সঙ্গ দিয়ে গেছেন মুশফিককে। ২০তম টেস্ট হাফসেঞ্চুরি থেকে ৩ রান দূরে আছেন লিটন, যেটাকে নিঃসন্দেহে তিনি পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরিতে রূপান্তর করতে চাইবেন।

১০০ টেস্ট খেলেছেন ৮৪ জন ক্রিকেটার, তাদের ভেতর ১০০তম টেস্টে এক ইনিংসে ১০০ বা তার বেশি রান করেছেন ১০ জন। প্রথম জন কলিন কাউড্রে আর সবশেষ এই তালিকায় নাম লেখানো ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। রিকি পন্টিং তার ১০০তম টেস্টের দুই ইনিংসেই করেছেন সেঞ্চুরি, জো রুট এবং ডেভিড ওয়ার্নার সেঞ্চুরিকে রূপ দিয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। মুশফিক এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় ১১তম ব্যক্তি হবেন কি না, সেটা জানা যাবে আজ সকালেই, যদিও অপেক্ষার অবসানটা হয়ে যেতে পারত ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনেই। শেষ আধঘণ্টায় আইরিশরা বল করতে অনেক সময় নিয়েছে, ফিল্ডিং সাজানোতেও অনেকটা সময় নষ্ট করেছে। দিনের ৯০তম ওভারটি গ্যাভিন হোয়েই করে ফেলার পর বাংলাদেশের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান আম্পায়ারদের অনুরোধ করেছিলেন একটা ওভার বাড়তি খেলাতে, আইরিশরা রাজি হয়নি। তাই মাঠে মিনিট দুয়েকের সংক্ষিপ্ত জটলার পর আম্পায়ার যখন বেলস ফেলে দিলেন, তখন নিশ্চিত হয়ে গেল জীবনের ১০০তম টেস্টে ৯৯ নটআউট হয়েই প্রথম দিনে মাঠ ছাড়ছেন মুশফিকুর রহিম। শেষ বলের আগের বলে চার মেরে সেঞ্চুরি পূরণের একটা প্রচেষ্টা ছিল তার, হোয়েইর ঝুলিয়ে দেওয়া বলে সøগ সুইপে মিড উইকেট অঞ্চলে বলও পাঠিয়েছিলেন। তবে সেøা-আউটফিল্ড আর ফিল্ডারের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে ১ রানের বেশি পেলেন না মুশফিক। প্রান্ত বদল করতেই বোঝা হয়ে গেল, কিছু নাটকীয়তা পরের দিনের সকালের জন্যও জমিয়ে রাখতে হচ্ছে!

দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা মমিনুল হক বলে গেছেন, দিনের খেলা শেষে ড্রেসিং রুমে ঢোকার সময় মুশফিকের মধ্যে ছিল না কোনো হতাশার ছাপ। ছিল না উৎকণ্ঠাও। মমিনুলের ভাষায়, ‘উনি অনেক (৩টা) ২০০ করেছেন, ১০০ করেছেন, উনি জানেন কীভাবে লম্বা সময় ব্যাট করতে হয়। উনি কালকে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি করবেন, লম্বা সময় ব্যাটিং করবেন আমরা এটাই চাই। এই উইকেটে আর আউট ফিল্ডে ৪৫০ রান প্রথম ইনিংসে অনেক।’ সেই অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ এখনো ১৫৮ রান দূরে, তাই বৃহস্পতিবার সকালে মুশফিক আরও সতেজ হয়ে নেমে নতুন করে শুরু করে ইনিংসটা আরও বড় করবেন সেটাই প্রত্যাশা। তেমনটা হলে জো রুট আর ডেভিড ওয়ার্নারের পর ১০০তম টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা তৃতীয় ক্রিকেটারকেও পেয়ে যাবে পৃথিবী।