তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) রাজনৈতিক দলগুলো। তারা রায়কে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পৃথক পৃথক অনুষ্ঠানে দলগুলোর নেতারা এই রায়কে স্বাগত জানান।
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বটতলায় কমল মেডি এইড আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দেশের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।’ তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত এসেছে, এটা কীভাবে গঠন হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। গ্রহণযোগ্য অনেকগুলো নির্বাচন এ ব্যবস্থায় হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।’ এদিকে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ আয়োজিত শহীদ ও আহতদের পরিবারসহ অসহায় ও দুস্থদের চিকিৎসা প্রদান অনুষ্ঠানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের রায় দেশে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ রায়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথচলা আবার সঠিক পথে ফিরে এসেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছিল।’
ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামী : এ রায়কে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রায়টি জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে এবং এতে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ শুনানির পর ঘোষিত রায় সবার মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। মামলার সঙ্গে জড়িত আইনজীবী ও সহযোগীদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।’
জুবায়ের দাবি করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা প্রথম রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরে জামায়াত, যা পরে দেশে গণদাবিতে পরিণত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল বিতর্কিত, ভোটবিহীন ও অনিয়মে ভরা।’
জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে এনসিপি : গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের যে রায় আদালত দিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে জাতি কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়েছে।
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য সরকারব্যবস্থা’ এমনটা উল্লেখ করে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, ‘নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। জুলাই সনদের আদেশে অস্পষ্টতা আছে। এটা আগের জাতির সামনে সরকারকে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। তাহলে এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে।’
জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে খেলাফত মজলিস : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের ঐতিহাসিক রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে খেলাফত মজলিস বলছে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের মধ্য দিয়ে জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দলটির আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘বিগত ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসন প্রলম্বিত হয়।’ তারা বলেন, ‘আজকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, তাতে দেশবাসী আনন্দিত। এতে জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে। আজকের দিনটি ঐতিহাসিক। এই রায় চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে। বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনকালীন সন্ত্রাস-সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া এই মুহূর্তে বিকল্প পথ নেই। আমরা উচ্চ আদালতসহ এই রায়ের পক্ষে যারা কাজ করেছেন সবাইকে মোবারকবাদ জানাই।’