কম্পনে আগুন জ্বলল ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে

নরসিংদীতে ভূমিকম্পের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। আহত হয়েছে আরও শতাধিক। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে জেলায় তীব্র ভূকম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নরসিংদীর মাধবদীতে ভূকম্পনটির উৎপত্তি; রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ভূমিকম্পের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জেলার প্রায় সব উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নরসিংদী শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার অনেক ভবন হেলে পড়েছে; বেশ কয়েকটি ভবনে ফাটলও দেখা গেছে। ভূমিকম্পে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনে অগ্নিকা- ঘটেছে। ভূমিকম্পে নিহতরা হলেন নরসিংদী সদর উপজেলার গাবতলী এলাকার মৃত আবদুল আজিজের ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৩৭), তার শিশুসন্তান ওমর মিয়া (১২), পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামের কাজেম আলী ভূঁইয়া (৭৫), ডাঙ্গা ইউনিয়নের ইসলামপাড়া নয়াপাড়া গ্রামের সিরু মিয়ার ছেলে নাসির উদ্দিন (৬০) ও শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামের মৃত শরাফাত আলীর ছেলে ফোরকান মিয়া (৪৫)।

বড় কোনো ভবন ধস না হলেও ছোট ছোট ফাটল দেখা দিয়েছে বহু ভবন ও বাড়িঘরে। এ সময় নরসিংদী শহরের গাবতলী এলাকায় ছয়তলা নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে একতলা ভবনের ওপর পড়লে বাড়ির মালিক দেলোয়ার হোসেন, ছেলে ওমর মিয়া ও মেয়ে তাসফিয়া আহত হন। তাদের নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবা-ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু পথে ছেলে ওমর মিয়া এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়। সরেজমিন দেখা যায়, গাবতলী জামেয়া কাশেমিয়া কামিল মাদ্রাসা মহিলা শাখার পেছনে নির্মিত হচ্ছে ছয়তলা ভবন। ইতিমধ্যে চারতলা ভবনের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর সেখানে লোকজন বসবাস করছে। ভূমিকম্পে ষষ্ঠতলার একটি দেয়াল ভেঙে পার্শ্ববর্তী বাড়ির ওপর পড়ে।

স্থানীয় এলাকাবাসী ওমর ফারুক জানান, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে দেলোয়ার হোসেন তার সন্তানদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তারা বাড়ির গেট থেকে রাস্তায় বের হওয়ার সময় তাদের ওপর ছয়তলা ভবনের দেয়াল ভেঙে পড়ে। পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামে মাটির ঘর ভেঙে কাজম আলী (৭৫) নামে এক বৃদ্ধ গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে স্বজনরা পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। আর ডাঙ্গা ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে নাসির উদ্দিন ভূমিকম্পের সময় ফসলি জমি থেকে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে আসার সময় রাস্তায় পড়ে গিয়ে মারা যান। শিবপুরের আজকিতলায় ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে ফোরকান মিয়া আহত হন। তাকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিসা দিয়ে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

এদিকে ভূমিকম্পে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাব-স্টেশনের একটি ট্রান্সফরমায় আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্য ট্রান্সফরমারগুলোর অধিকাংশ সংযোগ ভেঙে পড়ে। খবর পেয়ে পলাশ ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পলাশ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুস সহিদ জানান, আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. এনামুল হক জানান, ভূমিকম্পে এ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

ঘোড়াশাল বাজারের জুতার দোকানি আলম মিয়া বলেন, প্রথমে ভূমিকম্প বুঝতে পারিনি পরে বুঝতে পারি যে এটি ভূমিকম্প। ঘোড়াশাল ঈদগাহ রোডের মারকাসুল সুন্নাহ তাহফিজুল কুরআন সুন্নাহ মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি সালা উদ্দিন আনসারী বলেন, আমাদের ছয়তলা ভবনের চার-পাঁচ জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা ভয় পেয়েছে, আতঙ্কিত ছিল। ভবনের মালিক আমানউল্লাহ বলেন, ভবনের কয়েক জায়গায় ফাটল হয়েছে। ভবনের সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গুলশানা কবির বলেন, ভূমিকম্পে আহত হয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ চিকিৎসা নিয়েছেন; গুরুতর কয়েকজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নরসিংদী পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম দুপুরে গাবতলী এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ভূমিকম্পে জেলায় শতাধিক আহত হওয়ার খবর পেয়েছি। যেকোনো দুর্যোগে জেলা পুলিশ সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে। নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, ভূমিকম্পে পাঁচজন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। জেলা প্রশাসনের হটলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে, যেখানে আহত ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। আর নিহতদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে। আর আহতদেরও চিকিসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।