চাঁদাবাজি রুখতে তাৎক্ষণিক সাজা

পটপরিবর্তনের পরই ঢাকাসহ সারা দেশে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে দেদার; এখনো তা অব্যাহত আছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা অস্বস্তিতে পড়েছেন। সরকার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ কঠোর হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর সব ইউনিটের প্রধানদের বার্তা দিয়েছে, চাঁদা আদায়কালে ধরা পড়লে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিক সাজা দিতে পারবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস না পেলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। চাঁদাবাজদের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় নেবে। পুলিশ নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে।

এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের নতুন তালিকা প্রায় প্রস্তুত। আগামী সপ্তাহে তালিকাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানোর কথা রয়েছে। তালিকায় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ সদস্য ও উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীদের নাম রয়েছে বলে পুলিশসূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, চাঁদাবাজির কারণে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবনে চরম অস্থিরতা ও ভীতি দেখা দিয়েছে। চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বড় শিল্পপতি। চাঁদাবাজি রোধে পুলিশ কিছু ‘নয়া কৌশল’ এবং ‘ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক সাজা’র ব্যবস্থার কথা ভাবছে। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। কোন কোন সেক্টরে চাঁদাবাজি হচ্ছে এবং কারা করছে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে বৈঠকে।

এখন নতুন স্টাইলে চাঁদাবাজি হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য চাঁদাবাজিতে লিপ্ত আছে। প্রতিদিন ফুটপাতসহ সব স্থানেই চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আগের মতোই স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করছেন বড় বড় রাজনৈতিক নেতা। তারা চাঁদা তুলছেন অস্থায়ী কাঁচাবাজার, খাবারের দোকান, বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, রাস্তা ও ফুটপাতে বসানো দোকানপাট থেকে।

বৈঠকে জানানো হয়েছে, ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা অসহায়। পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা মিলে চাঁদা আদায় করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে পুলিশের অভিযানে চাঁদাবাজরা ধরা পড়লেও কিছুদিন যেতে না যেতেই জামিনে বের হয়ে ফের চাঁদাবাজি শুরু করে। চাঁদাবাজরা এখন হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এ কারণে অনেক সময় চাঁদা দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ থাকছে না ব্যবসায়ীদের কাছে। পুলিশও লাইনম্যান দিয়ে চাঁদা ওঠাচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজদের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করার সাহস না পেলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। পুলিশের কোনো সদস্য সম্পৃক্ত থাকলে তাকে সাসপেন্ড করা হবে; মামলাও করা হবে। চাঁদাবাজিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।’

তাৎক্ষণিক সাজা : বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত একজন অতিরিক্ত ডিআইজি দেশ রূপান্তরকে জানান, বৈঠকে সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশ কঠোর অবস্থানে গেছে। হাতেনাতে ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ প্রয়োগ করব আমরা। জেলা পর্যায়ে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে নেওয়া হবে।’

দল ও মতের দিকে না তাকানোর নির্দেশ : পুলিশের বৈঠকগুলোতে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় নিতে দল ও মতের দিকে না তাকানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা খুব জরুরি। চাঁদাবাজি লাগামহীন হয়ে পড়ায় পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দ্রুত বিচার আইনে মামলা হলে বিচার প্রক্রিয়া যাতে দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং অপরাধীরা তাৎক্ষণিক সাজা পায় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। বৈঠকে পুলিশের ইউনিটগুলোর গোপন প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

টোকেন দিয়ে চাঁদা আদায় : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন ভবন বা প্লট মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় চাঁদাবাজদের একটি বড়ক্ষেত্র। টাকা দিতে অস্বীকার করলে নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয়, শ্রমিকদের মারধর করা হয় এবং কখনো কখনো নির্মাণসামগ্রী লুট করা হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার ও দোকান মালিকরা চাঁদাবাজির বড় শিকার। ফুটপাতে বসা হকারদের প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। যানবাহন থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে টোকেন দিয়ে বা সরাসরি চাঁদা আদায় করা হয়। এ কারণে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়; ভোগান্তির শিকার হয় সাধারণ মানুষ। মহাসড়কে চাঁদাবাজি রোধ করা পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ : পুলিশের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। চাঁদাবাজদের লালন-পালন করছে থানা-পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। কিছুতেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তালিকা করেও কাজ হচ্ছে না। প্রতিদিন সারা দেশে গড়ে ৫০ লাখ টাকার চাঁদা তোলা হচ্ছে। এর একটি অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের কাছে। বাকি অর্থ থানা-পুলিশ, বিভিন্ন সংস্থার সদস্য ও স্থানীয় নেতাদের পকেটে। ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজসহ সব অপরাধীকে ধরতে পুলিশ কাজ করছে। পুলিশের কোনো সদস্যের চাঁদা আদায়ের তথ্য-প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। থানার ওসিদের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।’

বেশি বখরা ওঠায় যারা : কাঁচাবাজার, ভ্যানগাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, কাপড়ের দোকান, ফুটপাতের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। উত্তরার আজমপুরের ফুটপাতের ব্যবসায়ী আবদুর রহমান জানান, পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি বেড়েছে। তাদের সঙ্গে পুলিশ ও নেতাদের সখ্য আছে। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আলী মিয়া জানান, চাঁদাবাজির কারণে সবজির দাম বেড়েছে। পাইকারি মার্কেট থেকে সবজি কিনে এলাকায় যাওয়ার পথেই একাধিক স্থানে গুনতে হয় নিদিষ্ট অঙ্কের চাঁদা। এরপর বাজারে বিক্রি শেষে লাইনম্যানদের দিতে হয় চাঁদার আরেকটি অংশ। সায়েন্স ল্যাব থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের ফুটপাত ও মূল সড়কে ক্ষুদ্র দোকান রয়েছে। দোকানভেদে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। টাকার ভাগ যাচ্ছে স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা ও পুলিশের কাছে। মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর থেকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন সিদ্দিক ও জাফর। গ্রামীণ ব্যাংক ভবন পর্যন্ত ফুটপাতের দায়িত্বে আছেন জালাল। ওই এলাকার ফুটপাতে চাঁদা ওঠান রিপন, রুবেল, ইমরান তালুকদার, মুসতাকিম ফয়সাল ও গালকাটা পারভেজ। মিরপুর-১ নম্বরের শাহআলী মাজারসংলগ্ন মহিলা কলেজের গেট থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন লাইনম্যান সুরুজ আলী। সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের সামনের এলাকায় আছেন লাইনম্যান নয়ন ও রুবেল। বাগদাদ মার্কেটের সামনে টাকা ওঠান আনোয়ার। গ্রামীণফোন সেন্টারের সামনে রবিউল, পল্টন মিয়া ও ফুট কবির ওরফে বরিশাইল্যা কবির, মুক্তবাংলা মার্কেটের সামনে আবুল কালাম ও সেলিম। ক্যাপিটাল টাওয়ারের সামনে আকবর, মুক্তিপ্লাজা মার্কেটের সামনে নুরু, হক প্লাজার সামনে শাহ আলম, শাহআলী, ১ নম্বর বেড়িবাঁধ এলাকায় নাবিল খান কাঁচাবাজার ও ফুটপাতের নিয়ন্ত্রক। তার বাহিনীতে রয়েছে ফারুক ওরফে জি মার্ট ফারুক, ছোট করিম, রাজু, শাহালম, মাইনুদ্দিন, সৌরভ, দীপু, ও সম্রাট। নীলক্ষেত বইপট্টি এলাকা থেকে চাঁদা তোলেন শাহিন ও তার সহযোগী শহিদ চাচা। বলাকা সিনেমা হলের সামনে লাইনম্যান সেলিম ও আরিফ। আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধ হয়ে উত্তরখানের রাস্তায় অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন লাইনম্যানরা চালকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে। আজমপুর মোড়, আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পূর্বে রেললাইন, ৭ নম্বর সেক্টরের ৩৫ নম্বর সড়ক, আমির কমপ্লেক্স থেকে এইচএম প্লাজা, গরীবে নেওয়াজ অ্যাভিনিউ, ময়লার মোড়, শাহ মখদুম অ্যাভিনিউতে প্রতিটি দোকান ও অটোরিকশা থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে।