আসামের গৌহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে টেস্ট ম্যাচ। আজ সোমবার ম্যাচের তৃতীয় দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বেশ বিপাকেই আছে স্বাগতিক ভারত। প্রথম ইনিংসে ২০১ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পরও ৪৮৯ রানের পাহাড় গড়ে প্রোটিয়ারা। এর পেছনে অন্যতম অবদান অল-রাউন্ডার সেনুরান মুথুসামির। দক্ষিণ আফ্রিকার এই নবীন ক্রিকেটারই তো বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান।
গতকাল ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে ২০৬ বলের ১০৯ রানের ইনিংস উপহার দেন ৮ম টেস্ট খেলতে নামা মুথুসামি, যা তার টেস্ট ক্যারিয়ারেরও প্রথম সেঞ্চুরি। মুথুসামির মায়ের নাম ভানী মুডালি। তার ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া সেনুরানকে ভানী ডাকেন ‘ফ্রিডম বেবি’। কারণ সে বছরেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটেছিল। গতকাল মুথুসামি যখন সেঞ্চুরির দিকে এগোচ্ছিলেন, ভানী মুডালি তখন ঘানার ব্যবসায়িক সফর শেষে ছিলেন ডারবানগামী বিমানে। পুরো সময়টাতেই তিনি ব্যাকুল ছিলেন ছেলের ব্যাটিং দেখার জন্য।
বিমান ডারবানে অবতরণের পরও ভানীর উত্তেজনা কমেনি। তার ভাষায়, ‘লাউঞ্জে সবাইকে অনুরোধ করছিলাম টিভির চ্যানেল বদলাতে। এরপর আমি পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম, যেন ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারি।’ শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেঞ্চুরির ঠিক আগমুহূর্তেই ভানী পৌঁছে যান নিজের ডারবানের বাড়িতে। টিভির সামনে বসে দেখেন ছেলের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। সেই মুহূর্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে লিখেন, ‘গুয়াহাটি স্টেডিয়ামের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান।’
ভানী মুডালির পূর্বপুরুষরা ১৯০০ সালের শুরুর দিকে তামিলনাড়ুর ভেলোর থেকে শ্রমিক হিসেবে জাহাজে করে লুকিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। চরম বর্ণবাদ, নানারকম দুর্দশা, বৈষম্য আর সংগ্রামের মাঝে তারা সেখানে থিতু হয়ে যান। ভানী মুডালির বাবা এবং শ্বশুর দুজনেই ক্রিকেট খেললেও বর্ণবৈষম্যের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে কেউই সুযোগ পাননি।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বর্ণবিদ্বেষীরা পিছু হঠে। ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই ঘটনাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। ভানী বলেন, ‘আমার ছেলের জন্মের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। সে বহু সংস্কৃতির মিলিত এক সমাজে বেড়ে ওঠে। সেনুরানের বাবা ও দাদা দুজনেই তার মাথায় ক্রিকেটের বীজ বপন করে দেন।’
কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সেই মুথুসামি তার বাবাকে হারান। পরিবার পড়ে যায় মহাসংকটে। কিন্তু ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন থেকে পিছু হঠেনি তার পরিবার। ভানী নিজেই ক্রিকেট সম্পর্কে জানতে শুরু করেন, কারণ ছেলেকে বল থ্রো ডাউন করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলাপরায়ণ সেনুরান ১৪ বছর বয়সে পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশ করেন। ২০১৩ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক, আর ২০১৯ সালে ভারতের বিপক্ষে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে হয়ে যায় আন্তর্জাতিক অভিষেক।
ভানী মুডালির শেকড় রয়ে গেছে ভারতে। তবু তারা নিজেদের সম্পূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই পছন্দ করেন। ভারতে গেলেও তারা শেকড়কে অনুভব করেন না। ভানী বলেছেন, ‘এটাই (দক্ষিণ আফ্রিকা) আমাদের দেশ। ভারতে গেলে ভিন্ন অনুভূতি হয়। মোটেও আপন মনে হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকাই আমাদের ঘর, আমাদের বেড়ে ওঠা। প্রোটিয়াস জার্সির ক্রেস্ট বুকে ধারণ করাটাই সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়।’