গত শুক্রবার ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারা দেশ। পরদিন শনিবার ফের তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় বিপদের কারণ, বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন উঠেছে, ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার অভিযানে কতটা সক্ষম দেশের একমাত্র জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের যে ধরনের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, সে ধরনের যন্ত্রপাতি সংস্থাটির নেই। তাদের জনবল সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব বেশ প্রকট। একসঙ্গে ২০-২৫টি ভবনের বেশি ভবনে কাজ করার সক্ষমতা তাদের নেই; আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ারের (স্বেচ্ছাসেবক) সংখ্যাও কম।
দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসই ভরসা। ভূমিকম্প, অগ্নিকান্ড, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড় ধস সব জায়গায়ই তাদের দেখা যায়। কিন্তু জনবলের কমতির কারণে ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে প্রায়ই বেকায়দায় পড়তে হয় সংস্থাটিকে। রাজধানীতে বা বিভাগীয় শহরগুলোতে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি মানুষের বসবাস। দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারের কাজে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফায়ার স্টেশন বা জনবল নেই। ফায়ার সার্ভিস বলছে, মেগা ভূমিকম্প হলে কোনো দেশের ফায়ার সার্ভিসেরই এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না। তবে পর্যাপ্ত ভলান্টিয়ার প্রস্তুত করছে ফায়ার সার্ভিস। ইতিমধ্যে ফায়ার সার্ভিসকে ডিসেন্ট্রালাইজ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সূত্র।
ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা দেশের ফায়ার সার্ভিসের নেই বলে মন্তব্য করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্নত দেশের পক্ষেও এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক ভলান্টিয়ার। ২০১০ দেশে ৪০ হাজার আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ছিল। এখন সংখ্যাটি হওয়ার কথা ছিল দুই বা তিন লাখ। কিন্তু আমাদের ভলান্টিয়ার আছে ৬০ হাজারের মতো। এ ছাড়া এখনো ভলান্টিয়ারদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি সরকারের।’
গত রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘ভূমিকম্প নিয়ে সবাইকে একটু সতর্ক থাকতে হবে। ভূমিকম্পের বিষয়ে সতর্কতা জানানোর কোনো অ্যাপ আমাদের দেশে নেই। ১০ সেকেন্ড আগে সতর্কতা জানানোর অ্যাপ অনেক দেশে আছে বলে কথিত। আমরাও চিন্তাভাবনা করছি এমন একটি অ্যাপ চালু করা যায় কি না।’ তিনি বলেন, ‘বাড়িঘর তৈরি করার সময় বিল্ডিংকোড মেনে চলতে হবে। না মানলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’ ফায়ার সার্ভিস সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘শুক্রবারে ভূমিকম্পের পর ফায়ার সার্ভিস দ্রুত রেসপন্স করছে।’
ভূমিকম্প পরবর্তী এক মহড়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ১০-১২ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় বড় ভূমিকম্প হবে। বড় ভূমিকম্প হলে পুরান ঢাকার অবস্থা হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। রেসকিউ অপারেশন চালানো যাবে না সেখানে; উদ্ধারকাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। আমরা শুধু ভূমিকম্পের ভয়াবহতা কমাতে পারি; রোধ করা সম্ভব নয়।’
দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ধারের সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রস্তুতি ও সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফায়ার সার্ভিসের এক উপপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর ভবনে আটকেপড়াদের উদ্ধারে হেভি ইকুইপমেন্ট প্রয়োজন। এগুলো নিয়ে ভলান্টিয়ার এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে বড় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এ ধরনের যন্ত্রপাতি আমাদের তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সবার আগে প্রয়োজন ফায়ার সার্ভিসের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি। প্রত্যেক স্টেশনে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পাশাপাশি ভলান্টিয়াররাও সেই স্টেশনের সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হবেন।’
চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ফায়ার সার্ভিসের ৫০ সদস্যের একটি বিশেষায়িত টিমকে ভূমিকম্প মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সে সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেছিলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগ, বিশেষ করে ভূমিকম্প মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশেষায়িত কোর্সের মাধ্যমে যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তারা একটি বিশেষায়িত টিম হিসেবে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।’
প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৫০ জনের একটি টিমকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কর্মকা- পরিচালনা করা কি সম্ভব? ফায়ার সার্ভিসের মতে, দেশে যেকোনো সময় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কাও রয়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় ফায়ার সার্ভিস ভূমিকা রাখতে কতটুকু সক্ষম, সে বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টাফ অফিসার (মিডিয়া) মো. শাহজাহান সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পর্যায়সহ আমাদের সব স্টেশনে ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজ করার মতো ইকুইপমেন্ট রাখা আছে। তবে মেগা ডিজাস্টার হলে সেটি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই। উন্নত দেশেও নেই। তাই এসওডি (স্ট্যান্ডার্ড অর্ডার অ্যান্ড ডিজাস্টার) ভিত্তিতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীসহ সব বাহিনীকে সমন্বিতভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার কাজ করতে হবে। ভলান্টিয়াররাও সহযোগিতা করবে; প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হবে।’
ভূমিকম্পের সময় করণীয় : ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত ও স্থির থাকতে হবে। ভবনের নিচতলায় থাকলে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। বহুতল ভবনে থাকলে নিচু হয়ে শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে খুঁটি শক্ত করে ধরে রাখতে হবে অথবা কলামের পাশে, বিমের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। সম্ভব হলে বালিশ, কুশন বা এ জাতীয় বস্তু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে হবে। ভূমিকম্প চলাকালে লিফট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভূমিকম্প থামার সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সংযোগ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। বারান্দা, ব্যালকনি, জানালা, বুকশেলফ, আলমিরা, কাঠের আসবাবপত্র বা কোনো ঝুলন্ত ভারী বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। হাতের কাছে টর্চ, হেলমেট, জরুরি ওষুধ এবং বাঁশি সংরক্ষণ করুন, যাতে প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়। ঘরের বাইরে থাকলে গাছ, উঁচু ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি প্রভৃতি থেকে দূরে খোলা স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। গাড়িতে থাকলে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামাতে হবে। ভূকম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকতে হবে। একটি ভূমিকম্পের পর আবারও ভূকম্পন হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ব্রিজ ও বিভিন্ন অবকাঠামো থেকে দূরে থাকতে হবে। জরুরি সেবার প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হটলাইন নম্বর ১০২-এ ফোন দিতে হবে।
সবার সম্মিলিত চেষ্টা ও সচেতনতায় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স।