স্বাস্থ্যমন্ত্রীরাও বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন

দেশের স্বাস্থ্য খাতে আস্থা-ভরসা নেই মন্ত্রী-এমপিদের। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন অবস্থায়ই সরকারি টাকায় বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০০৯-১৪ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে মজিবুর রহমান ফকির ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার ৭৮০ টাকা নেন চিকিৎসা খরচ বাবদ। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সরকারি কোষাগার থেকে ১ লাখ টাকা নিয়েছেন বিদেশে চিকিৎসার জন্য। অথচ তিনি বলতেন, ‘দেশের মানুষ দেশেই সেবা নিক, এটাই আমাদের চাওয়া।’

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়ায় বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের চেয়ে ২০ হাজার কোটি বেশি।’ ভারতীয় সূত্রমতে, ৫ আগস্টের আগে দেশটিতে প্রতি বছর ২৫ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে যেতেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় বড় হাসপাতাল হয়েছে শহরে-গ্রামেও। বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিং হোম হয়েছে। শিল্প হিসেবে অনেক বিনিয়োগ হলেও আস্থায় নেয়নি দেশের মানুষ। সরকারি আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরা যখন সিঙ্গাপুর, চীন, ভারতে চিকিৎসা নেন, তখন এটি জনগণের কাছে প্রশ্ন তৈরি করে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ায় কী প্রভাব পরে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইএফডি) নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অবকাঠামো হয়েছে, কারিগরি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, উন্নত মেডিকেল ইকুপমেন্ট এসেছে কিন্তু এসব দিয়ে যে সঠিক চিকিৎসা হবে, সেই ভরসাটাই তৈরি হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘গ্রামের হাসপাতালগুলোয় এখনো পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, সেবার মান বাড়েনি। এসব যে নেই সেটাও সঠিক তদারকি হয় না। এখানে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিতরা মানবিক দৃষ্টিসম্পন্ন হননি। বড় বড় ডিগ্রি আছে কিন্তু সেবার কোনো মানদ- নেই। আন্তর্জাতিক সেবার মান অনুসরণ করা হয় না। এজন্যই মানুষ কষ্ট করে হলেও বিদেশে যেতে চায়। ধনীরা তো সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখেছে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন বলেছিলেন, ‘এমপি-মন্ত্রীরা দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। প্রধানমন্ত্রী তো বিদেশ যাচ্ছেন না। তিনি তার চোখ তো বাংলাদেশেই পরীক্ষা করিয়েছেন। এভাবে যদি আমাদের সংসদ সদস্য (এমপি) এবং মন্ত্রীরা দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, তাহলে দেশের চিকিৎসা সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।’

বিগত সরকারের হিসাবে দেশে ১৫ হাজার চিকিৎসক থেকে ৩৫ হাজারে উন্নীত হয়েছে, ১৮ হাজার নার্স থেকে ৪৫ হাজার হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মান বেড়েছে। হাসপাতালের বেড ৪০-৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৭৫ হাজার হয়েছে। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা প্রায়ই বলতেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে সব মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদেরও দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা আলোচিত হয়েছিল বহুবার। দেশে চিকিৎসায় অবহেলা ও এ অভিযোগে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে প্রতিনিয়ত।

এত এত উন্নতি হলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর তুলনায় শয্যা ও জনবলের সংখ্যা খুবই কম, যার কারণে রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকা, প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানামুখী দুর্নীতির কারণে হাসপাতালে সেবার মান খুবই খারাপ। রোগীদের প্রতি অবহেলা, অমানবিক আচরণ এবং অপচিকিৎসার মতো ঘটনায়ও তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ও অনেক বেশি। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেককেই বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেতে হয়, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আবার অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকই আন্তর্জাতিকমানের সেবা দিতে ব্যর্থ। চিকিৎসকদের অনেকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন।

এদিকে এশিয়ার দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের হার যে দেশগুলোয় কম তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ফলে জনবল সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ও সেবার মানহীনতা থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা।

যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ভারতে যান। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী এ দেশে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে দেশটির সীমিত ভিসা ইস্যুও কারণে। অথচ দেশে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে সাধারণ রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান এ দেশে এসে হাসপাতাল করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা এলেও এ সংকট দূর হবে না, যতক্ষণ না আমাদের নিজস্ব মানসম্মত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।