আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলের নির্বাচনী ইশতেহারের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে বিএনপি। দেশের নারী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ সাতটি বিষয় সামনে রেখে নির্বাচনী এ ইশতেহার তৈরি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ-সংক্রান্ত পোস্টার প্রকাশেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। গত সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া মনোনয়ন না পাওয়া বহু নেতার সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি কথা বলে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ওপরও পৃথকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিরোধ মেটানোর জন্য।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর বিভিন্ন জেলায় মনোনয়ন-সংক্রান্ত বিরোধ খতিয়ে দেখবেন তারা। এ ছাড়া নানা অভিযোগে ইতিপূর্বে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া নেতাদেরও ফেরানো হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলের ইশতেহারের মূল বিষয়গুলোতে সাধারণ মানুষের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে মনোনয়ন-সংক্রান্ত বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির গঠিত টিম প্রার্থীদের দুর্বলতা যাচাই করছে এবং মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। শীর্ষ নেতৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত ওই টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রার্থী তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিরোধপূর্ণ প্রতিটি আসনের সব পক্ষকে ঢাকায় ডেকে কথা বলছেন। ইতিমধ্যে গুলশান কার্যালয়ে একাধিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। গুলশান কার্যালয়ের বাইরেও সুবিধাজনক স্থানে মনোনয়নবঞ্চিতদের ডেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তারা। বৈঠকগুলোতে মনোনয়নবঞ্চিতদের দলীয় ঐক্য ধরে রাখা, দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলা এবং দলের নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জনভোগান্তি সৃষ্টি হয় বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কোনো কর্মসূচি থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীদের নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে জয়পুরহাট, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের কয়েকটি আসনের মনোনয়নবঞ্চিতদের ডেকে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব। পর্যায়ক্রমে বিরোধপূর্ণ সব আসনের মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বৈঠকে কিছু সদস্য বলেন, বড় দলে কিছু আসনে বিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। অধিকাংশ আসনেই ঘোষিত প্রার্থীরা এলাকায় গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়। তবে কয়েকটি আসন পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
বৈঠক সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার পুস্তক আকারে ছাপা হবে। এত বড় ইশতেহার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না বা তারা সেভাবে পড়ে না। তাই আগামী নির্বাচনের জন্য যে ইশতেহার তৈরি করা হবে, সেটির মূল বিষয়গুলো সার-সংক্ষেপ আকারে আগেভাগে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষি কার্ড, কীভাবে কৃষকদের ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে এসে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায়।
দলীয় সূত্র জানায়, এবারের ইশতেহার গঠিত হবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে। নির্বাচনী শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ইশতেহারে বিএনপির ৩১ দফার মূল বিষয় অবাধ নির্বাচন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোট, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে।
জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি এবার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য আলাদা প্রতিশ্রুতি রাখছে। এ তালিকায় রয়েছে আলেম-ওলামা, হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যুবক, কৃষক, নারী ও প্রবীণ নাগরিক। ইশতেহারে কওমি মাদ্রাসার উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন ও ধর্মচর্চার বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিরাপত্তা সেল, উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর কার্যক্রম চালুর প্রতিশ্রুতি যুক্ত হবে। যুবসমাজকে লক্ষ্য করে বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স।
কৃষকদের গুরুত্ব দিয়ে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিঋণ সহজ করা এবং ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা। এ ছাড়া নারীর নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এগুলোও ইশতেহারের অংশ হচ্ছে।
দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। নেতারা আশা করছেন, ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও গ্রুপভিত্তিক প্রতিশ্রুতি এ তিনের সমন্বিত ইশতেহার বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে নতুন গতি এনে দেবে।
এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে দলের বহিষ্কার হওয়া যোগ্য নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে দলটি। দলটির নেতারা বলেছেন, ইতিপূর্বে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচন অনেক চ্যালেঞ্জের। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে ঘর শক্তিশালী করতে বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির দপ্তরের সূত্রমতে, এর অংশ হিসেবে গত তিন মাসে দলটির দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এ সুযোগ পেয়েছেন।
এ নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে আবেদন এবং দলীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে। বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিনসহ গত সপ্তাহে এক চিঠিতেই ৬৫ জন, গত নভেম্বর মাসে ২৮ জন এবং তার কিছুদিন আগে ১০ জনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় এমপি প্রার্থীদের সুপারিশের ভিত্তিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে বহিষ্কৃতদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।’