র‍্যাব-১৫–তে নজিরবিহীন গণবদলি

কক্সবাজারে কর্মরত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-১৫–এর প্রায় সব কর্মকর্তা ও সদস্যকে হঠাৎ করেই প্রত্যাহার করেছে র‌্যাব সদর দপ্তর। ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে এনে সংযুক্ত করা হয়েছে সদর দপ্তরে। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের ভিত্তিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জেলা কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে গঠন করা হয় র‌্যাব–১৫ ব্যাটালিয়ন। অন্যান্য ব্যাটালিয়নের মতো একাধিক জেলায় নয়—শুধু কক্সবাজারের জন্যই মোতায়েন ছিল এই ইউনিট। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা চোরাচালানসহ নানা অপরাধ কক্সবাজারকে ঘিরে রেখেছে। 

স্থানীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, র‌্যাবের কথিত সিভিল টি–এফএস সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা–বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধে সহযোগিতা করে আসছিল এবং র‌্যাব কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে মাসোহারা আদায় করতো।

সূত্র জানায়, প্রতিটি র‌্যাব কর্মকর্তারই আলাদা ফিল্ড স্টাফ (এফএস) থাকে, যারা সিভিল টিম হিসেবে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করে। অভিযোগ উঠেছে—কক্সবাজারে এই সিভিল টিমের সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখতো এবং বিনিময়ে অর্থ লেনদেন করতো। এসব অভিযোগ সামনে আসার পরই কক্সবাজার র‌্যাবের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। একইসাথে বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা টু–আইসি–সহ প্রায় সব কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছে।

র‌্যাব সদর দপ্তরের পাঁচটি পৃথক কোয়ার্টারের নথিপত্র থেকে জানা যায়, বাবুর্চি, সুইপার, সুবেদার, হাবিলদার, এসআই, নায়েক, কর্পোরাল, এএসআই, কনস্টেবল, সিপাহী ও সৈনিকসহ মোট ৬৩৪ জন সদস্যের বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। তিন শতাধিক সদস্যকে প্রত্যাহার করে অন্য ইউনিটে পাঠানো হয়েছে এবং সমান সংখ্যক সদস্যকে বিভিন্ন ইউনিট থেকে এনে কক্সবাজারে বদলি করা হয়েছে।

র‌্যাব সদর দপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কমান্ডার বিএন–এর অনুমোদিত উপপরিচালক মেজর ফয়সাল আহমেদ স্বাক্ষরিত ১৯ নভেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ জন সদস্য এবং একই তারিখে আরেক প্রজ্ঞাপনে আরও ২০০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়। ১২ নভেম্বরের আরেক প্রজ্ঞাপনে ৬২ জন ও ১৭ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনে আরও ১০০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৭ নভেম্বর অতিরিক্ত ৭৪ জন সদস্যকে রদবদলের আওতায় আনা হয়।

সূত্র আরও জানায়, কক্সবাজার ইউনিটে কর্মরত বাবুর্চি ও সুইপারসহ প্রায় সবাইকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কথিত সিভিল টিমের কর্পোরাল ইমাম ও লুৎফরের ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে—তারা সরাসরি সিও–এর সঙ্গে কাজ করতেন এবং বড় চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন। কর্মকর্তা এহেতেশাম ও নাজমুলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন সূত্র, যা কক্সবাজারসহ র‌্যাব সদর দপ্তরে আলোচনায় রয়েছে।

র‌্যাব সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার পরিচালক জানান, প্রত্যাহারকৃত কমান্ডিং অফিসার এক বছরের বেশি সময় কক্সবাজারে দায়িত্ব পালন করায় তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত কয়েকদিনে তিন শতাধিক কর্মকর্তা ও সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে, যা তার ভাষায় ‘নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ’। 

তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কি না—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার জানা নেই, খোঁজ নিতে হবে।’ তার মতে, কক্সবাজারে কর্মরত সব সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়নি এবং বিষয়টি অপারেশন শাখা থেকে পরিচালিত হচ্ছে।

র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা–বাণিজ্যসহ অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কোনো সদস্য যদি এ ধরনের কাজে জড়িত থাকে, অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র‌্যাব বরাবরই তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের শাস্তি দিয়ে থাকে। এখানেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে।’

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় র‌্যাবের অপারেশন নিয়ে বহুদিন ধরেই স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সন্দেহ রয়েছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় অভিযোগ উঠে—কুতুপালং র‌্যাব ক্যাম্পের কর্মকর্তা পুলিশের ৩০ ব্যাচের কামরুজ্জামান একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬০ লাখ টাকা ও ৪ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছিলেন, কিন্তু পরে তার অংশবিশেষ ভাগাভাগির অভিযোগ ওঠে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা এফএস নিয়োগের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সাথে গোপন যোগাযোগ রাখেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে।

সামুদ্রিক সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল জেলা কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে র‌্যাব–১৫। তবে বিগত সরকারের সময় গুম, ক্রসফায়ার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগে এ ইউনিট নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। বিশেষ করে কাউন্সিলর একরামুল হত্যা মামলা কক্সবাজারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।