র‌্যাগিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আতঙ্কের নগ্নরূপ

সাম্প্রতিক সময়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মেসে ডেকে নিয়ে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ আবারও আমাদের সামনে তুলে ধরেছে র‌্যাগিং নামের সেই প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা, যা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল বহু আগেই। কিন্তু সত্য হচ্ছে, র‌্যাগিং এখন শুধু লুকানো নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস সংস্কৃতির ‘অঘোষিত অধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে বসেছে।

শের আলী (২০) নামের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী যিনি রংপুর থেকে স্বপ্ন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন রাজধানী শহরে উচ্চশিক্ষা নিতে, মুষ্টিমেয় তথাকথিত সিনিয়র তাকে কখনো এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখে, কখনো চড়-থাপ্পড় মেরে, কখনো উলঙ্গ করে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অপমান করে রাতভর যে নির্যাতন করেছে, সেটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নৃশংসতার দৃষ্টান্ত মিলবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পেরেছি?

র‌্যাগিং সাধারণত সিনিয়রদের এক ধরনের ক্ষমতা-প্রদর্শনী। তারা মনে করেন, জুনিয়রের ওপর শাসন বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাদের অধিকার। এই মানসিকতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি সমাজের সেই অসুস্থ কাঠামোর অংশ, যেখানে বয়স, ব্যাচ বা পদ-পদবির ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা হয়।

শের আলীর ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম ‘শাসন’ করার নামে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং মানবিক মর্যাদা ধ্বংস করা হয়েছে। এটি র‌্যাগিং নয়, সরাসরি অপরাধ। র‌্যাগিংয়ের নাম দিয়ে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার এই প্রক্রিয়াই সবচেয়ে ভয়ংকর।

বিশ্ববিদ্যালয় যখন আতঙ্কের জায়গা : বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় স্বাধীন চিন্তার আশ্রম। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে এসে ভয়, অপমান ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করেন তাদের শিক্ষাজীবন। এতে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

নেই প্রশাসনের নজরদারি : প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংবিরোধী নীতি থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই প্রয়োগ করা হয় না। তদন্ত কমিটি, নোটিস, শাস্তি সুপারিশ এসবের পরও শাস্তি প্রায়শই সহজ হয়ে আসে। ফলে সিনিয়র-জুনিয়র অসুস্থ ক্ষমতার খেলা চলতেই থাকে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের স্থানীয় জনগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দোকানপাট, বাসাভাড়া, পরিবহনসহ অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে স্থানীয়রা প্রতিষ্ঠানটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এই নির্ভরতা দাবিদাওয়া ও চাপ তৈরির কারণ হয়। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারিতে না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

র‌্যাগিং কোনো মজা নয়, এটি সহিংসতার সাংস্কৃতিক রূপ, যা একজন শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পুঁথিগত বিদ্যার জায়গা নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, নিরাপত্তা ও শ্রদ্ধার পরিবেশ নিশ্চিত করার জায়গা। তাই প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবারই দায়িত্ব র‌্যাগিং নামের এই অপসংস্কৃতি নির্মূলে কঠোর অবস্থান নেওয়া।

চাই এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের, সহযোগিতার এবং মানবিকতার; ভয়ের নয়। এখন সময় এসেছে র‌্যাগিংকে ‘ট্র্যাডিশন’ নয়, একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখার এবং প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানানোর।

লেখক : শিক্ষার্থী, পঞ্চম সেমিস্টার, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ, ব্যাচ-২৮, গণ বিশ্ববিদ্যালয়