‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ পেল চূড়ান্ত লাইসেন্স

কার্যক্রম শুরুর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংকটির অনুকূলে চূড়ান্ত লাইসেন্স ইস্যু করার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে জমা দেয় সরকার।

জানা গেছে, দেশের পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ও শক্তিশালী ব্যাংক করার উদ্যোগ নেয় সরকার। ব্যাংক রেজ্যুলশন অর্ডিন্যান্সের আওতায় এটি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় মূলধনি ইসলামী ব্যাংক। একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নতুন ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করবে। নতুন ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসছে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে। প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।

এর মাধ্যমে নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করতে আর কোনো বাধা থাকল না অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ নভেম্বর প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের। যেখানে আরজিএসসি থেকে কোম্পানি নামে ছাড়পত্র, ব্যাংকের চলতি হিসাব খোলাসহ ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধিবিধান পূরণের দায়িত্ব পড়ে সরকারের ওপর।

জানা গেছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছে। রাজধানীর মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।

গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহ থেকেই সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংক রেজলু্যুশন অর্ডিন্যান্স পাঁচটি ব্যাংকে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন হবে।

গভর্নর জানান, দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় (এনবিএফআই) আইন মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে এবং এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সাহায্য পাওয়া যাবে। কোন কোন ব্যাংক ও এনবিএফআই খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাদের সতর্ক করা হবে এবং পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হবে না, বিশেষ কারণেও হবে না। যখন দরকার হবে, তখন করা হবে। এর জন্য আইন করা হয়েছে, আলাদা বিভাগ করা হয়েছে। তা ছাড়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করতে যাচ্ছি। এতে সরকার পুরোপুরিভাবে কমিটেড।

গভর্নর জানান, আগামী দিনে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে, তারা এটি অনুধাবন করবে। যেহেতু আর্থিক খাতে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেটি মোকাবিলা করার জন্য যে প্রক্রিয়াগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটাকেও তারা বিশ্লেষণ করে সমর্থন করবে এবং এ প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পাঁচ ইসলামি ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংক বেতন-ভাতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চেয়েছিল, তখনই এই পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যাংক পাঁচটিকে।

ব্যাংকগুলো এখন এই পরামর্শ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়নি বলেও জানা গেছে। নতুন এ ব্যাংকটি যাতে টিকে থাকে, এজন্য খরচ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী রয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তরে ওই পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের পর এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সভাপতিত্ব করেন। ব্যাংক পাঁচটি বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য ১ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা চেয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে।

জানা গেছে, এসব ব্যাংকের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংক বাড়তি খরচ করতে চায় না। এজন্য খরচ কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে সরকার থেকে মূলধনের টাকা আনার প্রক্রিয়া নিয়ে দ্রুত কাজ হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এই পাঁচটি ব্যাংককে প্রায় ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই অর্থ ফেরত দিতে পারেনি।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো একীভূত হওয়ার পর আমানতকারীরা ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের সময়সূচি জানানো হবে। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ইতিমধ্যে ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের নতুন পর্ষদও গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই পর্ষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। পর্ষদের অন্য সদস্যরা হলেন অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব এম সাইফুল্লাহ পান্না, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমিন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব শেখ ফরিদ।

জানা যায়, নতুন এই ব্যাংকে সমানসংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের মধ্যে পেশাদার ব্যাংকার, হিসাববিদ ও আইনজীবী থাকবেন। এ ছাড়া সার্চ কমিটির মাধ্যমে এমডিসহ শীর্ষপর্যায়ের যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।