কৃষ্ণসাগরে দুটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ওই ট্যাংকারগুলো মস্কোর কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের অংশ ছিল। গত শুক্র ও শনিবার এ দুটি জাহাজে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার (এসবিইউ) কর্মকর্তারা। এর মধ্যে হামলার শিকার গাম্বিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার কাইরোসে থাকা ২৫ জন নাবিককে উদ্ধার করেছে তুরস্কের কোস্ট গার্ড। তারা নিরাপদে রয়েছেন। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশিও রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি নাবিকরা হলেন মাহফুজুল ইসলাম প্লাবন, আজগর হোসেন, আল আমিন হোসেন এবং হাবিবুর রহমান। একজন ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, এসবিইউ ও নৌবাহিনীর যৌথ অভিযানে ‘সি বেবি’ নামের সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ হামলার বিষয়ে রাশিয়া এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। সূত্রটি জানায়, দুটি ট্যাংকারই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কার্যত পরিষেবা থেকে ছিটকে গেছে। তার ভাষায়, এটি রুশ তেল পরিবহন খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। রাশিয়া নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন ‘ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স’ ব্যবহারের মাধ্যমে শত শত ট্যাংকার দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে।
তুরস্কের সমুদ্রবিষয়ক কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটির পানির ওপরে থাকা অংশে সামান্য ক্ষতি হয়েছে এবং কোনো আগুন লাগেনি। জাহাজটি তুরস্কের উপকূল থেকে প্রায় ৩০ মাইল (৫০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থান করছিল। জাহাজের গতিপথের তথ্য বলছে, শুক্রবার রাতে এটি গতি কমিয়ে উপকূলের দিকে ফেরার চেষ্টা করছিল। তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাহাজের কর্মীরা উদ্ধার হওয়ার কোনো অনুরোধ করেননি। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে একটি অগ্নিনির্বাপক টাগবোট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ হামলাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের ভাষায়, এসব হামলা এ অঞ্চলে নৌ-চলাচল, প্রাণহানি, সম্পদ ও পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে ‘বিরাটের’ গন্তব্য সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি। শিপিং-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, এটি নির্দেশনার অপেক্ষায় কৃষ্ণ সাগরে অবস্থান করছিল। জাহাজটি এ বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে। পরে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অন্যদিকে কৃষ্ণ সাগরের কাছাকাছি আরেক জায়গায় আরেকটি রুশ অপরিশোধিত তেলবাহী আরেক জাহাজেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গাম্বিয়ার পতাকাবাহী কাইরোস নামের ওই ট্যাংকারে থাকা ২৫ জন নাবিকদের সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলার সময় দুটি জাহাজের কোনোটিই তুর্কি জলসীমায় ছিল না। ভিডিওতে দেখা গেছে, তুর্কি টাগবোটগুলো উপকূল থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে থাকা কাইরোসে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। শনিবার তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, কাইরোসের ওপেন ডেকে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
জাহাজটি থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি নাবিক চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা আজগর জানান, তুর্কি জলসীমায় ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর তিনটি রোবোটিক নৌকার হামলায় কাইরোস আক্রান্ত হয়। হামলার পরপরই জাহাজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে সব নাবিক আগুন থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন এবং তুর্কি কোস্ট গার্ড দ্রুত উদ্ধার করে। মেরিন ফ্লিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেদী হাসান জানান, জাহাজটির চীনা মালিক নাবিকদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি আরও জানান, তাদের দেশে পাঠানো হবে নাকি কোম্পানির অন্য কোনো জাহাজে পাঠানো হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়; আজ সোমবারের মধ্যে তা জানা যেতে পারে।
প্রথম বিস্ফোরণ ঘটা জাহাজ কাইরোস ২০০২ সালে নির্মিত, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৮৯ ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার ট্যাংকার এটি। বিস্ফোরণের সময় তুরস্কের উপকূল থেকে প্রায় ২৮ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল। এটি এ মাসের শুরুতে ভারতের একটি বন্দর থেকে রওনা হয়ে রাশিয়ার ব্ল্যাক সাগরঘেঁষে নোভোরোসিস্ক বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আরেক জাহাজ ‘বিরাট’ ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৩ ডিডব্লিউটি ক্ষমতাসম্পন্ন। জাহাজটি আঘাতপ্রাপ্ত হয় তুরস্কের উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরে।
কাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার নোভোরোসিস্ক বন্দরের একটি মুরিং পয়েন্টে সামুদ্রিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে কাজাখস্তান থেকে রাশিয়া হয়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তেল সরবরাহ করা হয়। হামলার পর কাজাখস্তানের জ¦ালানি মন্ত্রণালয় জানায় যে, তারা রপ্তানিকৃত তেল বিকল্প রুটে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে। নোভোরোসিস্কের ওপর আগেও একাধিকবার ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএনএন ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও মন্তব্য পায়নি।