নিঃস্ব হচ্ছেন নন-ব্যাংক শেয়ারহোল্ডাররা

একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণার পর এবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) শেয়ার শূন্য হওয়ার পথে। গত ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ৯টি এনবিএফআই প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। তবে বন্ধের সিদ্ধান্তের পরও গতকাল মঙ্গলবার এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের লেনদেন হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পুঁজিবাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন বন্ধ হতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হলো পিপলস লিজিং; ইন্টারন্যাশনাল লিজিং; এফএএস ফাইন্যান্স; ফারইস্ট ফাইন্যান্স; বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স; প্রিমিয়ার লিজিং; জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই জেড ক্যাটাগরি বা দুর্বল মানের কোম্পানি হিসেবে শেয়ারবাজারে লেনদেন হচ্ছে। পুঁজিবাজারের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানটির নাম হলো আভিভা ফাইন্যান্স।

তালিকাভুক্ত এসব কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১৪৮ কোটি ৪০ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৯টি। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে পিপলস লিজিং ৭৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৩৫ দশমিক ৬৭, এফএএস ফাইন্যান্সে ৭৪ দশমিক ৮৫, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৫ দশমিক ৫৪, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সে ১৮ দশমিক ৩৫, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৫৩ দশমিক ৩২, জিএসপি ফাইন্যান্সে ৪৭ দশমিক ৩৪ এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

জানা গেছে, আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া এনবিএফআই খাতের আরও ১১ প্রতিষ্ঠান বন্ধের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে। সেগুলো হলো সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামী ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, উত্তরা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ও ফার্স্ট ফাইন্যান্স। আর ইউনিয়ন ক্যাপিটালকে টিকে থাকার পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে গতকাল শেয়ারবাজারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের খবরে আটটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দরপতন হয়েছে। লেনদেন শেষে পিপলস লিজিং শেয়ারদর প্রায় ১০ শতাংশ বা ৭ পয়সা কমে ৬৭ পয়সায় নেমেছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ১০ শতাংশ বা ৯ পয়সা কমে ৮১ পয়সা, এফএএস ফাইন্যান্সে প্রায় ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বা ১০ পয়সা কমে ১ টাকা ১০ পয়সা, ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ বা ৭ পয়সা কমে ৭৩ পয়সা, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ বা ২০ দশমিক ১০ পয়সা কমে ২ টাকা ১০ পয়সা, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে প্রায় প্রায় ১০ শতাংশ বা ৮ পয়সা কমে ৭৭ পয়সা, জিএসপি ফাইন্যান্সে প্রায় ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বা ১০ পয়সা কমে ১ টাকা ৮০ পয়সা এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে প্রায় ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বা ১০ পয়সা কমে ১ টাকা ৫০ পয়সায় নেমেছে।

এর আগে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ডিসেম্বর মাসেই শুরু হতে যাচ্ছে। একীভূত হওয়া ব্যাংক হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণসহ সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ খাতে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাছাই করতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে সংকটাপন্ন ছয়টি তফসিলি ব্যাংকের সম্পদের গুণমান যাচাই করা হয়। সম্পদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিশাল অঙ্কের শ্রেণীকৃত ঋণ এবং বিনিয়োগ এবং মূলধন ঘাটতি থাকায় আলোচ্য ব্যাংকগুলো মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার মাধ্যমে সরকারি মালিকানায় শরিয়াহভিত্তিক একটি ইসলামী ব্যাংক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়। তবে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক পিএলসির শেয়ার মালিকানা বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় আইসিবি ইসলামী ব্যাংককে ওই প্রক্রিয়ার আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো এক বছরের অধিক সময় ধরে তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং তাদের তারল্যসংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, শ্রেণীকৃত বিনিয়োগ, ঋণ ও অগ্রিমের হার, প্রভিশন ঘাটতি এবং তারল্যসংকট এমন পর্যায়ে উপনীত হয়, যা তাদের আমানতকারী ও অন্য পাওনাদারদের প্রদেয় পাওনা পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংকের ভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকায় আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে টেকসই ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী ব্যাংক খাতের এ পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে একীভূত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রস্তাব দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অধীন তফসিলি ব্যাংক ‘হস্তান্তরকারী ব্যাংক’ এবং সরকার কর্তৃক স্থাপিতব্য নতুন ব্যাংকটি ‘হস্তান্তর গ্রহীতা ব্যাংক’ হিসেবে গণ্য হবে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকটি বাণিজ্যিকভাবে ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

একীভূত হওয়ার পর পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন পুঁজিবাজারে স্থগিত রয়েছে। ফলে কথা আসছে, নন-ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোরও শেয়ার লেনদেন স্থগিত হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে শেয়ারের বিপরীতে ক্ষতিপূরণের দাবি থাকলেও সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার একীভ’ত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক-এর’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়েছে। গত ১ ডিসেম্বও চূড়ান্ত অনুমোদন ও লাইসেন্স ইস্যুও গতকাল থেকে ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।