ভোজ্য তেল নিয়ে ব্যবসায়ীদের ভোজবাজি চলছেই

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরকারকে পাশ কাটিয়ে দাম বাড়ানোর এই প্রচেষ্টা কয়েক মাস ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে এই দাম বাড়ানোর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, সরকারকে না জানিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে। গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। 

এদিকে ঢাকার কারওয়ান বাজার, রামপুরা, বাড্ডা, সেগুনবাগিচাসহ কয়েকটি এলাকার খুচরা দোকান এবং কয়েকটি সুপারশপ ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করেছেন। অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম বাড়ানো হয়েছে ৯ টাকা। একইভাবে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৯২২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে খুচরা বাজারের মুদি দোকানগুলোতে এখনো নতুন দামের তেলের সরবরাহ খুব বেশি নেই। বেশিরভাগ দোকানেই এখনো পুরনো দামের তেল বিক্রি করছে। তবে কারওয়ান বাজারের একটি মুদি দোকানে ৫ লিটারের রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেল ৯৬৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ওই বোতলের গায়ে উৎপাদনের তারিখ দেওয়া আছে গত নভেম্বর মাসের ২৮ তারিখ। অর্থাৎ ৫ লিটারের বোতলে দাম বাড়ানো হয়েছে ৪৩ টাকা।

একইভাবে স্বপ্ন সুপারশপের অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও একই দামে ৫ লিটারের সয়াবিন তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে। সেখানে রূপচাঁদার পাশাপাশি বাড়তি দামে পুষ্টি ব্র্যান্ডের তেলও পাওয়া যাচ্ছে। সুপারশপটির অনলাইনে তীর ও রূপচাঁদার এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল ১৯৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে একটি কোম্পানির তেল এখনো সেখানে ১৮৯ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া রূপচাঁদার দুই লিটারের বোতল ৩৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৯৬ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অর্থাৎ দুই লিটারের বোতলে দাম বেড়েছে ১৮ টাকা। জানা গেছে, গত ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে একটি চিঠি দেয়। সেখানে তারা গত মাসের ২৪ তারিখ থেকে নতুন দাম কার্যকরের কথা জানায়। তাদের প্রস্তাবিত নতুন দাম অনুযায়ী এক লিটারের বোতল ১৯৯ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৯৮৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ১৭৯ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ১৬৯ টাকা। 

কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার ব্যবসায়ীদের তেলের দাম বাড়ানোর আবেদনের কোনো অনুমোদন দেয়নি। সরকারের অনুমোদন ছাড়া ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে পারেন না। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যে প্রক্রিয়ায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছেন, এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কিছুই জানত না। এটা আধা ঘণ্টা আগে জেনেছি। কোম্পানিগুলো সামগ্রিকভাবে একত্রিত হয়ে এ কাজটি করেছে। সামগ্রিকভাবে একত্রিত হয়ে করা এই কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আলোচনা করে কর্মপদ্ধতি ঠিক করব। এটার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। গতকাল (মঙ্গলবার) আমরা ক্রয় কমিটিতে টিসিবির জন্য তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছি। সয়াবিন তেল ৫০ লাখ লিটার, রাইস ব্রান তেল ১ কোটি লিটার। ওনারা (ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী) আজকে (বুধবার) যে দামে বাজারে বিক্রি করছেন, সেটা থেকে প্রায় ২০ টাকা কমে আমাদের তেল দিয়েছেন। তাই বাজারে ২০ টাকা বেশি দামে তেল দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না। গতকালকেই আমরা তাদের কাছ থেকে কিনেছি।’ 

ব্যবসায়ীদের ওপর ক্ষুব্ধ বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ আছে কী নেই, সেটা আমাদের পদক্ষেপের মাধ্যমেই জানতে পারবেন, নিশ্চিতভাবে আছে। একটু ব্যবসায়ীদের এ প্রশ্ন করুন। আমরা পদক্ষেপ নেব, আলোচনায় বসেছি। এটা তো মার্কেটে গিয়ে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করার জিনিস না।’ 

তিনি জানান, যারা আইন লঙ্ঘন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে যত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, সবই নেওয়া হবে। বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘যদি তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো কারণ থাকে, আমরা আনন্দের সঙ্গে আলোচনা করব। আমরা তো সরবরাহ ব্যবস্থা গতিশীল রাখতে চাই। সরবরাহ ব্যবস্থা আমরা বিঘিœত করতে চাই না।’ এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা কয়েক মাস ধরেই করছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করেই সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৬ টাকা, পাম অয়েলের দাম ১৩ টাকা, খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ৩ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২৩ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেটাও ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই। সে সময় উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন জানিয়েছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক স্বীকৃত না হবে, ততক্ষণ ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রেস রিলিজ দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। আমি তো এটা অনুমোদন দেইনি। যেটার অনুমোদন দেইনি, সেই জিনিস প্রেস রিলিজ আকারে যাবে কেন।’ 

সে সময়েও ব্যবসায়ীরা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন তেলের দাম বাড়ানোর জন্য। ১৩ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা। সচিব মৌখিকভাবে নির্দিষ্ট হারে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি দেন। কিন্তু বৈঠক শেষে যখন সচিব বাণিজ্য উপদেষ্টার অনুমোদনের জন্য যান, তখনই বিপত্তি ঘটে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাম বৃদ্ধির বিষয়ে অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানান। উপদেষ্টা অনুমোদন না দেওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি করে ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গণমাধ্যমে জানিয়ে দেন। পরে বাণিজ্য উপদেষ্টা কড়া প্রতিক্রিয়া জানালে ব্যবসায়ীরা ঘোষিত দামে ভোজ্যতেল বাজারজাত করেননি। এর আগেও ব্যবসায়ীরা একাধিকবার তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গতকাল প্রস্তাবিত অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের খসড়া নিয়ে বৈঠক হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচএম সফিকুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ আইন অনুযায়ী কিছু পণ্যের মূল্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দেয়। মূল্য নির্ধারণের একটা সুনির্দিষ্ট সূত্র আছে। হঠাৎ করে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার সমিতি যদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করে তেলের দাম বাড়ায়, আমি বলব, তা আইনের লঙ্ঘন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া তেলের দাম বৃদ্ধি ভোক্তার অধিকারের প্রশ্ন। বাণিজ্য উপদেষ্টা যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি। প্রতিযোগিতা আইন আছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে। যদি কেউ মজুদ করে দাম বাড়ায়, সেখানে বিশেষ আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও আছে। আমরা সেই আইনের প্রয়োগ দেখতে চাই।’