ট্রাম্পকে উপেক্ষা ভারতের নিচ্ছে রাশিয়ার জ্বালানি

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ভারতকে ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে’ জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার নয়াদিল্লির রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হায়দরাবাদ হাউজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন এ ঘোষণা দেন। ২৩তম ভারত-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে গত বৃহস্পতিবার দিল্লি আসেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিন বছর পর পুতিনের ভারত সফরে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছে মোদি সরকার। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারত নিরপেক্ষ নয়, আমাদের অবস্থান শান্তির পক্ষে। সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্যের জেরে ভারতীয় পণ্যে শাস্তিমূলক ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে পুতিনের এই সফরটি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি ভালো সুযোগ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

২০২২ সালে উজবেকিস্তানে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-এর শীর্ষ সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখোমুখি হয়ে মোদি বলেছিলেন, এটা যুদ্ধের সময় নয়। শুক্রবার দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে পুতিনের পাশে বসে মোদির মন্তব্য ভারত নিরপেক্ষ নয়, শান্তির পক্ষে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার ভারত সফরে এলেন পুতিন। মোদির পাশে বসে তিনি বলেন, ভারতকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত রাশিয়া। পুতিন বলেন, ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য আমরা জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। রাশিয়া তেল, গ্যাস, কয়লাসহ ভারতের জ্বালানি উন্নয়নের জন্য যা দরকার, তার নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী। তিনি আরও বলেন, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করার লক্ষ্যে অনেক চুক্তি স্বাক্ষর করছি আমরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একাধিকবার দাবি করেছেন, তার হুমকির জেরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে ভারত। এই পরিস্থিতিতে পাশাপাশি বসে দুই রাষ্ট্রনেতার বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দুই নেতার যৌথ সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ‘উষ্ণ অভ্যর্থনার’ জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ধন্যবাদ জানান পুতিন। পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পর্কে পুতিন বলেন, আমাদের মধ্যে গঠনমূলক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। নিজেদের মধ্যে হওয়া চুক্তিগুলোকে ‘আকর্ষণীয়’ বলে মন্তব্য করেন পুতিন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে নতুন চুক্তির বিষয়গুলো জানানো হয়। পুতিনের সফরকে কেন্দ্র করে এবার দুই দেশের বাণিজ্য ও কৃষি খাতের সম্পর্ক জোরদার করতে একাধিক চুক্তি হয়েছে। চুক্তির দর কষাকষি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন পুতিন। দুই দেশের বাণিজ্যে নিজেদের জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ায়, এ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি। ভারতের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক প্রকল্প নির্মাণেও সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন পুতিন। পাশাপাশি সামরিক ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা করেছেন মোদি ও পুতিন।

২০২৪ সালে রাশিয়া ভারতের মোট অশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৬ শতাংশ সরবরাহ করেছে। চাপের মুখে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। পাশাপাশি বৈঠকে পুতিন মোদিকে ইউক্রেন পরিস্থিতি ও শান্তি প্রচেষ্টা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন বলে জানান। মোদি বলেন, ইউক্রেন নিয়ে ভারত সবসময় শান্তির পক্ষে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে; মহামারীর আগের তুলনায় প্রায় ছয়গুণ। তবে ভারতের রপ্তানি মাত্র ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। দুই নেতা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচিতে সম্মত হয়েছেন। চাকরি, স্বাস্থ্য, শিপিং ও রাসায়নিক খাতে একাধিক চুক্তি সই হয়েছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যই ছিল শীর্ষ বৈঠকের মূল বিষয়। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, যদিও ২০১৯-২৩ সালে রুশ অস্ত্রের অংশ কমে ৩৬ শতাংশে নেমেছে। বৈঠকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান ও পারমাণবিক সাবমেরিন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাতে রাষ্ট্রীয় ভোজের পর পুতিন ভারত ত্যাগ করেন।

দুই দিনের ভারত সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লির পালমে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে পুতিনের উড়ান। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন মোদি। করমর্দন এবং সৌজন্য বিনিময়ের পরে একই গাড়িতে সওয়ার হন দুই রাষ্ট্রনেতা। রাতে প্রধানমন্ত্রীর ৭ লোককল্যাণ মার্গের বাসভবনে পুতিন তার সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেন। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান মোদি-পুতিন। এর পরে তারা দুজনে একসঙ্গে যান মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থল রাজঘাটে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।